কুমিল্লায় কথা-কবিতা-গানে রবীন্দ্র-নজরুল স্মরণ অনুষ্ঠান

“তুমি কি কেবলই ছবি শুধু পটে লিখা” এবং “ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি”—দুই কবির দুই কালজয়ী বাণীকে সামনে রেখে কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘কথা-কবিতা-গানে রবীন্দ্র-নজরুল স্মরণ’ অনুষ্ঠান। জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ কুমিল্লার আয়োজনে বৃহস্পতিবার (২৭শে আগস্ট) সন্ধ্যায় নগরীর লাকসাম রোডস্থ গ্র্যান্ড দেশপ্রিয় রেস্টুরেন্টের কনফারেন্স রুমে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, সংগীত ও সৃষ্টিশীলতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি তাঁদের কালজয়ী সৃষ্টির মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও চিরন্তন আবেদন নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই ছিল এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। কথা, কবিতা পাঠ ও সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে দুই মহান কবির জীবন, দর্শন, সাহিত্যকর্ম ও মানবতাবাদী চেতনা স্মরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ কুমিল্লার সভাপতি আঃ মালেক। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

আলোচনা পর্বে বক্তারা বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁদের সৃষ্টি কোনো নির্দিষ্ট সময় বা প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানবতা, সাম্য, প্রেম, দ্রোহ, অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তির যে বাণী তাঁদের সাহিত্য ও সংগীতে উচ্চারিত হয়েছে, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বর্তমান প্রজন্মের কাছে দুই কবির সাহিত্য ও সংগীতের গভীর তাৎপর্য তুলে ধরতে নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চার প্রয়োজন রয়েছে।

বক্তারা আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শন, প্রকৃতি ও প্রেমের চেতনা যেমন বাঙালির মননকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি নজরুলের বিদ্রোহ, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও শোষণমুক্তির প্রত্যয় বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনাকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। তাঁদের সাহিত্য ও সংগীত বাঙালির মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে।

অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্তিম সময়ের কিছু লেখা পাঠ করেন জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ কুমিল্লার সাবেক সভাপতি ও বর্তমান সদস্য প্রফেসর নিখিল চন্দ্র রায়। তাঁর আবেগঘন পাঠ উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে গভীর অনুভূতির সৃষ্টি করে।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল কুমিল্লার স্থানীয় শিল্পীদের সংগীত পরিবেশনা। শিল্পীরা রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলসংগীত পরিবেশন করে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন। মনোমুগ্ধকর গান ও কবিতার আবহে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও আবেগঘন। দুই কবির কালজয়ী সৃষ্টির পরিবেশনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত সংস্কৃতিপ্রেমীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক আবহ।

পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ কুমিল্লার সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর মশিউর রহমান ভূইয়া। তাঁর সাবলীল সঞ্চালনায় আলোচনা, কবিতা পাঠ ও সংগীত পরিবেশনের বিভিন্ন পর্ব সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়।

অনুষ্ঠানে অংশ নেন- অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান, দিলনাশী মোহসীন, বদরুল হুদা জেনু, প্রফেসর মৃণাল কান্তি গোস্বামী, প্রফেসর অনুকূল চন্দ্র দাশ, রীতা চক্রবর্তী, হালিম আব্দুল্লাহ, মোঃ জাহাঙ্গীর আলম হাজারী, অমৃত লাল দত্ত, মোতালেব খান, তপন তাহের, মোহাম্মদ উল্ল্যাহ, মোঃ মোখলেছুর রহমান, মোঃ বুলবুল ইকবাল, সেলিম মাওলা, রাহুল তারণ পিন্টু, এডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার ও ফটো সাংবাদিক শ্যামল বড়ুয়া ববিসহ পরিষদের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ও সদস্য ছাড়াও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, স্থানীয় শিল্পী, সাহিত্যপ্রেমী এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

স্মরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথি ও দর্শক-শ্রোতারা বলেন, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্য-সংগীতকে কেন্দ্র করে নিয়মিত এ ধরনের আয়োজন সমাজে সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাংলা সাহিত্য, সংগীত, মানবিক মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশে এ ধরনের আয়োজন আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।

কথা, কবিতা ও গানের আবেশে আয়োজিত এ স্মরণ অনুষ্ঠান দুই মহান কবির কালজয়ী সৃষ্টির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *