বাংলাদেশ-চীন শিক্ষাবিনিময়ে গুরুত্ব পাচ্ছে যৌথ গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়ন

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিক্ষা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে শিক্ষা বিনিময়কে অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। এর আওতায় শিক্ষার্থী বিনিময়ের পাশাপাশি যৌথ গবেষণা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বুধবার (২৬শে আগস্ট) স্থানীয় সময় বিকেলে চীনের গুয়াংঝৌতে সাউথ চায়না নর্মাল ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত ‘চীন-বাংলাদেশ এডুকেশন এক্সচেঞ্জ সম্মেলনে’ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। সম্মেলনে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সহযোগিতা, একাডেমিক বিনিময় এবং দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাগত অংশীদারত্ব বাড়ানোর বিষয়ে উভয় পক্ষের আগ্রহের কথা জানানো হয়।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়াতে শিক্ষা বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা যেমন চীনে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পাবে, তেমনি চীনা শিক্ষার্থীরাও বাংলাদেশে এসে সামার স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে।

তিনি বলেন, শুধু বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার্থী চীনে পাঠানোর মধ্যেই সহযোগিতা সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথ গবেষণা, ল্যাবরেটরি ব্যবহারের সুযোগ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে এই সম্পর্ককে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।

চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা ও আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, সেখান থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে বলে মন্তব্য করেন মাহ্দী আমিন। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা ও পলিটেকনিক খাতে চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে কাজে লাগানো গেলে শিক্ষার মান ও দক্ষতা উন্নয়নে তা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এর আগে বুধবার সকালে চীন-বাংলাদেশ শিক্ষা সহযোগিতা নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মূলত চারটি বিষয়ে আলোচনা করা হয়—চীনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ বাড়ানো, দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, যৌথ গবেষণা এবং কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন।

মাহ্দী আমিন বলেন, বর্তমানে চীনে পড়াশোনা করা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একাডেমিক পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা আরও উন্নত করার বিষয়টি চীনা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান শিক্ষাগত চাহিদার কথা তুলে ধরে তিনি শীর্ষস্থানীয় চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয় অংশীদারত্ব এবং চীনা ভাষা শিক্ষায় যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

বাংলাদেশে চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সহায়তায় ‘চীনা ভাষা কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দেন তিনি। এসব কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত শিক্ষক, মানসম্মত কোর্স, প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা থাকার কথা বলেন তিনি।

পাশাপাশি চীনা সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান মাহ্দী আমিন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি জানার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।

সম্মেলনে বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনও দুই দেশের মধ্যে আরও সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি যৌথ গবেষণা, বৃত্তি, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিনিময় এবং স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের পাশাপাশি যৌথ মাস্টার্স ও পিএইচডি কর্মসূচি চালুর ওপর জোর দেন। দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে টেকসই একাডেমিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহ্বানও জানান তিনি।

চীনের পক্ষ থেকে গুয়াংডং প্রদেশের শিক্ষা বিভাগের প্রাদেশিক প্রধান পরিদর্শক জু শিমিন আন্তর্জাতিক শিক্ষার ক্ষেত্রে গুয়াংডংয়ের আগ্রহের কথা তুলে ধরেন। তিনি আরও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে গুয়াংডংয়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

সম্মেলনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষে ২৬১ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী গুয়াংডংয়ে পড়াশোনা করেছেন। এ ছাড়া ২০২৫ সালে ২০ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী গুয়াংডং সরকারের বৃত্তি পেয়েছেন।

বাংলাদেশের জন্য চীনের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে সম্মেলনে উঠে আসে। বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষা বিনিময়কে শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা বা শিক্ষার্থী পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণা, প্রযুক্তি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। এতে দুই দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বাস্তব ক্ষেত্রে দক্ষতা ও জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ বাড়বে।

সম্মেলনে সাউথ চায়না ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, সাউথ চায়না নর্মাল ইউনিভার্সিটি, জিনান বিশ্ববিদ্যালয়, সাউদার্ন মেডিকেল ইউনিভার্সিটি, গুয়াংডং ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, গুয়াংঝু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, গুয়াংঝু ইউনিভার্সিটি অব চাইনিজ মেডিসিন, গুয়াংডং ওশান বিশ্ববিদ্যালয়, হারবিন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (শেনঝেন) এবং গুয়াংডং পলিটেকনিক নর্মাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া ছিলেন।

চীন সরকারের আমন্ত্রণে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন আয়োজন ও আলোচনায় অংশ নিতে তিন দিনের সরকারি সফরে বর্তমানে চীনে অবস্থান করছেন শিক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন।

সম্মেলনের মাধ্যমে দুই দেশ শিক্ষা সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়ে নিজেদের আগ্রহের কথা জানিয়েছে। শিক্ষার্থী বিনিময়ের পাশাপাশি গবেষণা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নকে সামনে রেখে এই সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *