বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন ও জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত সময়কে সামনে রেখে নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো (ফাইভ ইয়ার স্ট্রাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম এন্ড ডেভেলপমেন্ট ২০২৬-২০৩১) চালু করেছে। নতুন এই কাঠামোতে দেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার নির্ধারণের পাশাপাশি উন্নয়নে নিজস্ব সম্পদ, বেসরকারি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে কাঠামোটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বিভিন্ন খাত নিয়ে আলোচনা হয়। এতে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীরাও অংশ নেন এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অর্থায়নের ধরন নিয়ে মতামত দেন।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে উন্নয়ন সহযোগীদের ভূমিকা নিয়ে আয়োজিত একটি অধিবেশনে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ডের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স দাইপাক এলমার। তিনি নতুন কৌশলগত কাঠামোতে বাংলাদেশের নিজস্ব সম্পদ ও বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি সরকারি ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানান।
তার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—বাংলাদেশের অর্থনীতি যত পরিবর্তিত ও পরিণত হচ্ছে, দেশটির সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতার ধরনও ততটা পরিবর্তিত হওয়া প্রয়োজন।
দাইপাক এলমারের মতে, উন্নয়ন সহযোগিতার প্রচলিত ধারণা শুধু অনুদান বা সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাজ হবে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও সহজে আসতে পারে এবং বড় পরিসরে উন্নয়ন অর্থায়ন সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
এ ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীরা বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং নতুন অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের উন্নয়ন ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু সরকারি অর্থ বা বৈদেশিক অনুদানের ওপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অবকাঠামো, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে।
নতুন কৌশলগত কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশ তাই উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি বিস্তৃত পদ্ধতির দিকে এগোতে চাইছে—যেখানে সরকারি অর্থের পাশাপাশি দেশের নিজস্ব সম্পদ, দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো হবে।
সুইজারল্যান্ড বলছে, বাংলাদেশের এই পরিবর্তিত উন্নয়ন বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা কাজ করতে প্রস্তুত। দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের পাশাপাশি বৃহত্তর উন্নয়ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করে অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহনশীল ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সুইজারল্যান্ডের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—উন্নয়নকে শুধু সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয় হিসেবে না দেখে অর্থনীতির বিভিন্ন অংশকে একই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রার পরবর্তী পর্যায়ে অর্থের পরিমাণের পাশাপাশি অর্থ কোথা থেকে আসছে এবং কীভাবে তা ব্যবহার করা হচ্ছে—এই দুটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সেই বাস্তবতায় ২০২৬–২০৩১ সালের কৌশলগত কাঠামো বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় অর্থায়নের নতুন একটি দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আনতে পারে।