গাঁজাকে অনেকে তুলনামূলক নিরাপদ মাদক হিসেবে দেখেন। কেউ কেউ এটিকে ব্যথা কমানো বা অন্য কিছু শারীরিক সমস্যার সম্ভাব্য চিকিৎসা হিসেবেও বিবেচনা করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর গবেষণা এই ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের এক পর্যালোচনায় গাঁজা নিয়ে সাম্প্রতিক পাঁচটি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ফল তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ব্যথা উপশম, মানসিক স্বাস্থ্য, আসক্তি, বমি-বমি ভাব ও পেটের জটিলতা, হৃদ্যন্ত্রের ঝুঁকি এবং গাঁজার বিভিন্ন জাতের প্রচলিত শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে।
বিজ্ঞানীরা অবশ্য গাঁজার সব সম্ভাব্য চিকিৎসাগত ব্যবহারকে অস্বীকার করছেন না। বরং তাদের বক্তব্য হলো, কোন রোগে এটি কতটা কার্যকর এবং কার জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
চিকিৎসায় গাঁজা ব্যবহারের অন্যতম প্রধান কারণ ব্যথা কমানো। কিন্তু উচ্চমানের গবেষণায় এর কার্যকারিতা এখনো স্পষ্ট নয়।
২০২১ সালে ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর দ্য স্টাডি অফ পেইন (আইএএসপি) গাঁজা ও ক্যানাবিনয়েডকে সাধারণভাবে ব্যথার চিকিৎসায় ব্যবহারের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ পায়নি। সংস্থাটি আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।
এরপরের গবেষণাগুলোও বিষয়টি আরও জটিল করেছে। একটি পর্যালোচনায় ২০টি গবেষণা ও প্রায় ১ হাজার ৪৫৯ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, গাঁজা বা ক্যানাবিনয়েড গ্রহণকারীদের যে ব্যথা কমার কথা বলা হয়েছে, তার বড় অংশ প্লেসিবো গ্রহণকারীদের মধ্যেও দেখা গেছে।
একটি বিশ্লেষণে ক্যানাবিনয়েড দিয়ে পাওয়া ব্যথা উপশমের ৬৭ শতাংশ প্লেসিবো গ্রুপেও দেখা যায়। অর্থাৎ রোগীর প্রত্যাশা এবং চিকিৎসাটি কাজ করবে—এই বিশ্বাস ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে গাঁজা কোনো ধরনের ব্যথায় কাজই করে না। বরং কোন ধরনের ব্যথায়, কোন রোগীর ক্ষেত্রে এবং কোন মাত্রায় এটি উপকারী হতে পারে—তা নির্ধারণে আরও ভালো গবেষণা প্রয়োজন।
গাঁজার ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর শক্তি।
আধুনিক গাঁজার অনেক জাতেই আগের তুলনায় বেশি মাত্রায় ক্যানাবিনয়েড, বিশেষ করে টিএইচসি, পাওয়া যায়। ভ্যাপিং ও কিছু এডিবল পণ্য থেকেও তুলনামূলক বেশি টিএইচসি গ্রহণ করা সম্ভব। ফলে কয়েক দশক আগের গাঁজার সঙ্গে বর্তমান বাজারের পণ্যের সরাসরি তুলনা করা কঠিন।
গাঁজার উচ্চমাত্রার ব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। নিয়মিত ব্যবহারের সঙ্গে বিভ্রম, প্যারানয়া এবং সাময়িকভাবে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মতো সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে প্রতিদিন গাঁজা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাইকোসিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের সমস্যা হাসপাতালে চিকিৎসারও প্রয়োজন তৈরি করতে পারে।
গাঁজাকে অনেক সময় অন্যান্য মাদকের তুলনায় কম ক্ষতিকর মনে করা হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এতে আসক্তির ঝুঁকি নেই।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় পাঁচজন গাঁজা ব্যবহারকারীর মধ্যে একজনের আসক্তি তৈরি হতে পারে। বারবার গাঁজা ব্যবহারের তাগিদ, একই প্রভাব পেতে ক্রমে বেশি গ্রহণের প্রয়োজন হওয়া এবং ছেড়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা—এসব আসক্তির লক্ষণ হতে পারে।
কম বয়সে ব্যবহার শুরু করা এবং পরিবারে আসক্তির ইতিহাস থাকা ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
গাঁজার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত জটিলতা হলো ক্যানাবিনয়েড হাইপারএমেসিস সিন্ড্রোম বা সিএইচএস ।
এতে বারবার বমি, বমি-বমি ভাব এবং তীব্র পেটব্যথা হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় গরম পানি দিয়ে গোসল করলে সাময়িক স্বস্তি পান। ফলে কেউ কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা গরম পানিতে গোসল করার চেষ্টা করেন।
সিএইচএস প্রথম বর্ণনা করা হয় ২০০৪ সালে। দীর্ঘদিন এবং ঘন ঘন গাঁজা ব্যবহার, বিশেষ করে উচ্চমাত্রার টিএইচসি-যুক্ত পণ্য ব্যবহারের সঙ্গে এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সিএইচএস-সংক্রান্ত জরুরি বিভাগে যাওয়ার ঘটনা দ্বিগুণ হয়েছে। একটি গবেষণার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে বছরে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষ এই সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন বলে অনুমান করা হয়েছে।
সিএইচএস-এর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হলো গাঁজা পুরোপুরি বন্ধ করা।
গাঁজার সম্ভাব্য ক্ষতি শুধু মস্তিষ্ক বা পরিপাকতন্ত্রে সীমাবদ্ধ নয়।
টিএইচসি রক্তপ্রবাহ ও হৃদ্যন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, নিয়মিত গাঁজা ব্যবহারকারীদের মধ্যে হৃদ্রোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে।
একটি গবেষণায় নিয়মিত গাঁজা ব্যবহারকারীদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের হার ২৫ শতাংশ এবং স্ট্রোকের হার ৪২ শতাংশ বেশি দেখা যায়। তবে এ ধরনের পর্যবেক্ষণ থেকে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রমাণ করা যায় না। আরও গবেষণা প্রয়োজন।
গাঁজা ধূমপানের ক্ষেত্রে ধোঁয়ার অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদানও আলাদা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গাঁজা কেনার বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘ইন্ডিকা’ ও ‘স্যাটিভা’ নাম দুটি বহুল পরিচিত। প্রচলিত ধারণা হলো, ইন্ডিকা বেশি শিথিল করে এবং ঘুম আনতে সাহায্য করে। স্যাটিভা নাকি বেশি উদ্দীপক।
কিন্তু গবেষণা এই সরল বিভাজনকে সমর্থন করে না।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, গবেষণায় ইন্ডিকা ও স্যাটিভার মধ্যে এমন কোনো সুস্পষ্ট রাসায়নিক বা জেনেটিক পার্থক্য পাওয়া যায়নি, যা এই দুই লেবেলের সঙ্গে প্রচলিত প্রভাবের দাবিকে নির্ভরযোগ্যভাবে মেলাতে পারে।
এর পেছনে বড় কারণ হলো গাঁজার ব্যাপক সংকরায়ন। বাজারে ব্যবহৃত জাতগুলোর নাম ও বৈশিষ্ট্য সবসময় একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ফলে শুধু ‘ইন্ডিকা’ বা ‘স্যাটিভা’ লেখা দেখে কোনো পণ্যের সম্ভাব্য প্রভাব অনুমান করা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভরযোগ্য নয়।
বিষয়টি এত সরল নয়।
গাঁজার কিছু নির্দিষ্ট উপাদান নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণা চলছে। কিছু ক্যানাবিনয়েড-ভিত্তিক ওষুধ নির্দিষ্ট চিকিৎসায় ব্যবহৃতও হয়। উদাহরণ হিসেবে ক্যানসার চিকিৎসায় বমি ও বমি-বমি ভাব নিয়ন্ত্রণে কিছু কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড ওষুধ অনুমোদিত হয়েছে।
ক্যানসার-সম্পর্কিত কিছু ব্যথার ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য উপকারের প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু এসব ফলাফলকে গাঁজার সব ধরনের ব্যবহার বা সব রোগীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাবে না।
এখানেই মূল সমস্যা। গাঁজা নিয়ে জনমনে প্রচলিত ধারণা এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের মধ্যে এখনো বড় ফাঁক রয়েছে।
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো গাঁজাকে ‘সম্পূর্ণ নিরাপদ’ বা ‘সম্পূর্ণ ক্ষতিকর’—এমন কোনো একটি সরল পরিচয়ে আটকে রাখছে না।
বরং গবেষণার বার্তা হলো, এর প্রভাব নির্ভর করতে পারে পণ্যের টিএইচসি-এর মাত্রা, ব্যবহারের ঘনত্ব, বয়স, ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক অবস্থা এবং ব্যবহারের ধরনসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গাঁজার সম্ভাব্য চিকিৎসাগত সুবিধা নিয়ে আরও কঠোর গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়েও আরও তথ্য দরকার।
গাঁজা তাই নিছক ‘নিরাপদ প্রাকৃতিক উপাদান’ নয়। আবার এর সম্ভাব্য চিকিৎসাগত ব্যবহারও একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। বিজ্ঞান এখনো এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে উত্তর খুঁজছে।
আর সেই উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো প্রচলিত ধারণা নয়, প্রমাণ।