তিন বছর কারাগারে ইমরান খান, চোখের দৃষ্টি নিয়ে নতুন উদ্বেগ পুত্রদের

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ক্রিকেট বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান খান তিন বছর ধরে কারাগারে। এই দীর্ঘ বন্দিজীবনের মধ্যেই তার স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ জানিয়েছেন দুই ছেলে কাসিম ও সুলেমান খান।

সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারা বলেছেন, বাবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের অভিযোগ, কয়েক মাস ধরে পরিবারের সদস্য, আইনজীবী ও ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের ইমরানের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।

ইমরান খানের কারাবাসের তৃতীয় বছর পূর্ণ হয়েছে ৫ই  আগস্ট। ২০২৩ সালের ওই দিন তোশাখানা মামলায় সাজা ঘোষণার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে একাধিক মামলায় তার বিরুদ্ধে সাজা ও মামলা চলতে থাকে। তিনি ও তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে।

ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে তার ডান চোখকে ঘিরে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার আইনজীবী পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টকে জানান, ডান চোখের প্রায় ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন ইমরান। তার চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিতে ডান চোখে Central Retinal Vein Occlusion (CRVO) শনাক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়। এটি চোখের রেটিনার একটি শিরায় রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার সমস্যা।

ইমরানকে জানুয়ারির শেষ দিকে ও ফেব্রুয়ারির শুরুতে ইসলামাবাদের পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (পিআইএমএস) নেওয়া হয়। সেখানে চোখ পরীক্ষা করা হয় এবং পরবর্তী চিকিৎসার সুপারিশ করা হয়।

তবে এ বিষয়ে সরকারি ও পারিবারিক বক্তব্য এক নয়।

ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সরকারি মেডিকেল বোর্ড জানায়, চিকিৎসার পর ইমরানের ডান চোখের দৃষ্টিশক্তির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বোর্ডের প্রতিবেদনে চশমা ব্যবহারের পর ডান চোখে ৬/৯ এবং বাম চোখে ৬/৬ দৃষ্টিশক্তির কথা বলা হয়। ডান চোখের ম্যাকুলার ফোলা কমেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে ইমরানের পরিবার ও ব্যক্তিগত চিকিৎসক এই সরকারি মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের সরাসরি পরীক্ষা করার সুযোগ না থাকায় তার প্রকৃত অবস্থার স্বাধীন মূল্যায়ন সম্ভব হয়নি।

ইমরানের দুই ছেলে কাসিম ও সুলেমান যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। তারা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর বাবার সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে পারেননি। ওই সময় ইমরান একটি হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে যান।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারা বাবাকে দেখতে পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদন করেন। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও সেই আবেদনের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাননি বলে জানিয়েছিলেন তারা।

এখন তিন বছর পূর্তির সময় তাদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

কাসিম ও সুলেমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বাবার বর্তমান স্বাস্থ্য সম্পর্কে তারা নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাচ্ছেন না। তাদের আশঙ্কা, কারাগারে সীমিত যোগাযোগের কারণে পরিস্থিতি সম্পর্কে বাইরের বিশ্বও পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানতে পারছে না।

ইমরান খানের কারাবাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার বন্দিত্বের ধরন।

জাতিসংঘের নির্যাতনবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক অ্যালিস জিল এডওয়ার্ডস ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইমরানের আটক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইমরানকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় রাখা হয়েছে।

জাতিসংঘের ওই বিশেষজ্ঞের কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইমরান প্রতিদিন প্রায় ২৩ ঘণ্টা নিজ কক্ষে থাকতেন। তার বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগও ছিল অত্যন্ত সীমিত। দীর্ঘমেয়াদি একাকী বন্দিত্ব আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

জুলাইতেও এ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ইমরান প্রায় ৩৩ মাস ধরে প্রায় সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় ছিলেন।

তবে পাকিস্তান সরকার ও কারা কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়। তাদের বক্তব্য, ইমরান কারাগারে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নির্ধারিত সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন।

ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তার সাবেক প্রতিপক্ষ ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের একাধিক কিংবদন্তিও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৪ জন সাবেক আন্তর্জাতিক অধিনায়ক পাকিস্তান সরকারের কাছে যৌথ আবেদন জানান। তারা ইমরানকে যথাযথ চিকিৎসা ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

এই তালিকায় ছিলেন ভারতের সুনীল গাভাসকার ও কপিল দেব। ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার গ্রেগ চ্যাপেল, ইয়ান চ্যাপেল, অ্যালান বর্ডার ও স্টিভ ওয়াহ। ইংল্যান্ডের মাইক অ্যাথারটন, নাসের হুসেইন ও মাইক ব্রিয়ারলিও এতে ছিলেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্লাইভ লয়েডও স্বাক্ষর করেন।

তাদের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল রাজনৈতিক সমর্থন নয়। বরং একজন সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক ও বিশ্বকাপজয়ী খেলোয়াড় হিসেবে ইমরানের মানবিক ও চিকিৎসাগত অধিকার নিশ্চিত করা।

ইমরান ১৯৯২ সালে পাকিস্তানকে প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন। পরে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং ২০১৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন।

ইমরানের কারাবাসকে পাকিস্তানের চলমান রাজনৈতিক সংঘাত থেকে আলাদা করে দেখা কঠিন।

২০২২ সালের এপ্রিলে অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর পর তিনি একের পর এক মামলায় জড়িয়ে পড়েন। ২০২৩ সালের আগস্টে তার গ্রেপ্তারের পরও বিভিন্ন মামলায় বিচার ও সাজা অব্যাহত থাকে।

তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্যসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়েছে। ইমরান ও পিটিআই বরাবরই অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও তোশাখানা-২ মামলায় ইমরান ও তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর আগে আল-কাদির ট্রাস্ট মামলাসহ অন্য মামলাতেও ইমরানের সাজা হয়েছিল। ফলে তার বর্তমান বন্দিত্বকে শুধু একটি মামলার তিন বছরের সাজা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ইমরানের মুক্তির প্রশ্ন এখনো পাকিস্তানের রাজনীতির অন্যতম বড় ইস্যু।

তার দল ৫ই  আগস্ট থেকে দেশব্যাপী আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। ইমরানের তিন বছর কারাবাস পূর্তিকে সামনে রেখে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়।

তবে রাজনৈতিক সমঝোতা বা সম্ভাব্য মুক্তি নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো সমাধান সামনে আসেনি।

ইমরানের শারীরিক অবস্থা সেই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ তার বয়স এখন ৭৩ বছর। দীর্ঘ কারাবাস, সীমিত যোগাযোগ এবং চোখের সমস্যার বিষয়টি তার পরিবার, দল ও আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে।

ইমরানের পুত্রদের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই উদ্বেগকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

তিন বছর পরও প্রশ্নটি তাই শুধু ইমরান খানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়। প্রশ্ন উঠছে তার স্বাস্থ্য, চিকিৎসার স্বাধীনতা এবং একজন বন্দির সঙ্গে পরিবার ও আইনজীবীদের যোগাযোগের অধিকার নিয়েও।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাকিস্তানের কারা কর্তৃপক্ষ ও সরকারের বক্তব্যের পাশাপাশি স্বাধীন চিকিৎসা পরীক্ষা ও নিয়মিত পারিবারিক যোগাযোগের মাধ্যমেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে পাওয়া সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *