ওয়ারী-বটেশ্বরের মাটির নিচের ইতিহাস থেকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে 

বাংলাদেশের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ওয়ারী বটেশ্বর’ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে ধারাবাহিকভাবে আলোচনায় রয়েছে। নির্মাতা রাজিব রাফির পরিচালনায় নির্মিত এই ১৫ মিনিটের চলচ্চিত্রটি একদিকে যেমন বাংলাদেশের ইতিহাস ও প্রত্নঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে, অন্যদিকে এর ব্যতিক্রমধর্মী নির্মাণশৈলী আন্তর্জাতিক দর্শকদেরও আকৃষ্ট করেছে।

সম্প্রতি ঢাকার ধানমন্ডিতে গ্যোটে-ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ -এর অডিটোরিয়ামে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা, গণমাধ্যম ও যোগাযোগ বিভাগ এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ফিল্ম সোসাইটির সহযোগিতায় চলচ্চিত্রটির একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।

এর আগে ২০২৫ সালে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব ক্লেরমঁ-ফেরঁ আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব -এ চলচ্চিত্রটির বিশ্বপ্রিমিয়ার হয়। উৎসবটির প্রতিযোগিতা বিভাগে স্থান পাওয়া বাংলাদেশি এই চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক সমালোচক ও দর্শকদের দৃষ্টি কাড়ে। কান চলচ্চিত্র উৎসবের পর এটিকে ফ্রান্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ওয়ারী বটেশ্বর’ প্রচলিত গল্প বলার ধারা অনুসরণ করে নাই। চলচ্চিত্রটি এগিয়ে যায় এক ঘুরে বেড়ানো আত্মার কণ্ঠে, যে সত্যিই মৃত নাকি শুধু হারিয়ে গেছে—তার কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই।

এই রহস্যময় যাত্রায় দেখা মেলে এক বোবা স্ত্রীর, স্বপ্নে বিভোর এক গোলরক্ষকের, অস্থির এক বাবার এবং হারিয়ে যাওয়া কিংবা অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার পেছনে ছুটে চলা কয়েকজন মানুষের। তাদের বিচ্ছিন্ন জীবন একসঙ্গে মিলিয়ে তৈরি হয়েছে স্মৃতি, অনুপস্থিতি, ইতিহাস ও মানবিক বিচ্ছিন্নতার এক কাব্যিক উপস্থাপন।

চলচ্চিত্রটি এমন এক প্রশ্নও তুলে ধরে—কোন ইতিহাস দৃশ্যমান, আর কোন ইতিহাস মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকে।

চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হলো, এটি সম্পূর্ণ ড্রোন ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে। ফলে পুরো গল্পটি দর্শক দেখেন এক অতিমানবিক বা পাখির চোখের দৃষ্টিকোণ থেকে। নির্মাতা রাজিব রাফির ভাষায়, এটি সময়, ভূদৃশ্য ও ইতিহাসের ভেতর দিয়ে এক “ম্যাজিক রিয়ালিস্ট” ভ্রমণ, যেখানে বাস্তবতা ও কল্পনার সীমারেখা বারবার অস্পষ্ট হয়ে যায়।

চলচ্চিত্রটির অনুপ্রেরণা এসেছে নরসিংদীর বেলাব ও শিবপুর উপজেলার প্রাচীন প্রত্নস্থল ওয়ারী-বটেশ্বর থেকে। প্রায় আড়াই হাজার বছর পুরোনো এই প্রত্ননগরীকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন দুর্গনগর হিসেবে মনে করেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা। ধারণা করা হয়, এটি প্রাচীন বাণিজ্যপথ ও নগর সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।

চলচ্চিত্রটি ঐতিহাসিক এই স্থানকে সরাসরি তথ্যচিত্রের মতো উপস্থাপন না করে, তার ইতিহাস, স্মৃতি ও লোককথাকে আধুনিক চলচ্চিত্র ভাষায় পুনর্নির্মাণ করেছে।

গ্যোটে-ইনস্টিটিউট এ  প্রদর্শনীর পর নির্মাতা রাজিব রাফি দর্শকদের সঙ্গে চলচ্চিত্রটির ভাবনা, নির্মাণশৈলী, গল্পের কাঠামো এবং স্মৃতি, অদৃশ্য ইতিহাস ও পরিচয়ের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।

তিনি বলেন, ক্লেরমঁ-ফেরঁ আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবে বিশ্বপ্রিমিয়ারের সময়ও দর্শকদের কাছ থেকে অসাধারণ সাড়া পেয়েছিলেন। ঢাকার প্রদর্শনীতেও দর্শকদের একই ধরনের আগ্রহ ও ভালোবাসা তাকে অনুপ্রাণিত করেছে।

ক্লেরমঁ-ফেরঁর পর চলচ্চিত্রটি ইতালির সেনজা ভেরোনা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেও প্রদর্শিত হয়েছে। পাশাপাশি কানাডার টরন্টোতে অনুষ্ঠিতব্য মাল্টি-কালচারাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের প্যানোরামা বিভাগেও চলচ্চিত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত হয়েছে।

এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি পেল বলে মনে করছেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা।

খনা টকিজ -এর ব্যানারে নির্মিত চলচ্চিত্রটির প্রযোজক আশিক মোস্তফা এবং সহ-প্রযোজক আদনান আহমেদ। গল্প ও পরিচালনায় রয়েছেন রাজিব রাফি। চিত্রনাট্য লিখেছেন রাজিব রাফি ও টোটো টিমোথি।

চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছেন ইমতিয়াজ নিলয়, শৈলেন পাল, সাবিকুন্নাহার কাকন, শ্যামল শিশির, টোটো টিমোথি, দীপঙ্কর দীপ, এমডি জনি, নাজিম উদ্দিনসহ আরও অনেকে।

চিত্রগ্রহণ করেছেন মাজহারুল রাজু, সম্পাদনা করেছেন কিসলু গোলাম হায়দার। শব্দ পরিকল্পনায় ছিলেন শাকির আহমেদ অন্তু এবং আবহসংগীত পরিচালনা করেছেন রায়হান রিজওয়ান।

‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ওয়ারী বটেশ্বর’ এমন একটি চলচ্চিত্র, যা সব প্রশ্নের উত্তর দেয় না। বরং গল্পের শেষ পর্যন্ত রহস্য অমীমাংসিত রেখে দর্শককে নিজস্ব ব্যাখ্যা খুঁজে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। কেউ এটিকে ইতিহাসের রূপক হিসেবে দেখবেন, কেউ স্মৃতি ও পরিচয়ের অনুসন্ধান হিসেবে, আবার কেউ হয়তো এটিকে কল্পনা ও বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক সিনেমাটিক অভিজ্ঞতা বলেই মনে করবেন।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উৎসবে অংশগ্রহণ এবং দেশ-বিদেশের দর্শকদের ইতিবাচক সাড়া প্রমাণ করে, বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে নতুন চলচ্চিত্র ভাষায় তুলে ধরার এই প্রচেষ্টা বিশ্বমঞ্চেও সমানভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *