ঘুমের আগেও কেন ‘প্রোডাক্টিভ’ হতে হয়?

মেডিটেশন অ্যাপ বা উইকেন্ড রিট্রিট কেন বাঁচাতে পারছে না শহুরে মধ্যবিত্তকে? রোগটা আসলে কোথায়?

সকাল সাড়ে আটটা। গুলশানের একটা করপোরেট বিল্ডিংয়ের বেসমেন্ট পার্কিং।

গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ। এসি চলছে। স্টিয়ারিং হুইলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে আছেন তানভীর। বয়স তিরিশের কোঠায়, একটি বহুজাতিক কোম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজার। তার হাতে এখনো সময় আছে। অফিসের ডেস্কে পৌঁছাতে আরও দশ মিনিট বাকি। কিন্তু এই দশ মিনিট সে স্টিয়ারিং হুইলে মাথা রেখে কাটায়। কোনো পডকাস্ট শোনে না, ফোন স্ক্রল করে না, আজকের মিটিংয়ের নোটও দেখে না।

সে শুধু চুপচাপ বসে থাকে।

কেন? কারণ এই দশ মিনিটই তার দিনের একমাত্র সময়, যখন সে কারও জন্য কোনো ‘আউটপুট’ তৈরি করছে না। সে কারও ইমেইলের রিপ্লাই দিচ্ছে না, কোনো সমস্যার সমাধান করছে না। সে শুধুই ‘আছে’।

তানভীরের এই দশ মিনিটের নীরবতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি এখন শহুরে মধ্যবিত্তের একটি নীরব মহামারী। ২০২৫ সালের একটি  জরিপের তথ্য বলছে, দেশের ৬৫ শতাংশ তরুণ পেশাজীবী তীব্র ‘বার্নআউট’ বা কর্মক্লান্তিতে ভুগছেন।

কিন্তু একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে। আমরা তো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। আমাদের ফোনে ‘Calm’ বা ‘Headspace’-এর মতো মেডিটেশন অ্যাপ আছে। উইকেন্ডে আমরা পাহাড়ে যাই, ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ করি, ইউটিউবে ‘লো-ফাই বিটস’ শুনে ঘুমানোর চেষ্টা করি।

তাহলেও কেন ঘুমের আগে বিছানায় শুয়ে বুক ধড়ফড় করে? কেন রাত দুইটায় ছটফট করতে করতে মনে হয়, “আজ তো সারাদিন তেমন কিছুই করা হলো না!”

উত্তরটা লুকিয়ে আছে আমাদের সমসাময়িক এক অদ্ভুত রোগের নামে— ‘প্রোডাক্টিভিটি টক্সিসিটি’ (Productivity Toxicity) বা উৎপাদনশীলতার বিষক্রিয়া।

সবাই যখন বার্নআউটের সমাধান হিসেবে ‘মেডিটেশন’ বা ‘বিশ্রাম’-এর কথা বলে, আমরা একটি বড় বিষয় এড়িয়ে যাই। আমরা আমাদের কাজের সময়কে তো বটেই, এমনকি আমাদের বিশ্রামের সময়কেও ‘মনিটাইজ’ বা অপ্টিমাইজ করার চেষ্টা করছি।

এখন আর কেউ শুধু ‘ঘুমায়’ না। তারা ‘স্লিপ সাইকেল ট্র্যাক’ করে। কেবল মন শান্ত করার জন্য মেডিটেশন করা হয় না, মেডিটেশন করা হয় যাতে পরের দিন অফিসে ‘ফোকাস’ বাড়ে এবং কোম্পানির রেভিনিউ বাড়ে। উইকেন্ডে পাহাড়ে যাওয়াটাও আর নিছক ঘোরাঘুরি নয়, সেটা হলো সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার মতো একটি ‘এস্থেটিক অভিজ্ঞতা’ অর্জন করা।

অর্থাৎ, বিশ্রামটাও এখন আর বিশ্রাম নেই। বিশ্রাম হলো পরের দিনের কাজের জন্য শরীরকে ‘চার্জ’ দেওয়ার একটি কৌশল।

আপনি যখন রাতের বেলা অবসরে একটা উপন্যাস পড়েন, তখন মনের এক কোণে একটা আওয়াজ বলে,”এই বইটা কি আমার কোনো স্কিল ডেভেলপ করবে? নাকি শুধু সময় নষ্ট হচ্ছে?” আমরা বিশ্রামকেও ‘টু-ডু লিস্ট’ এর একটি আইটেম বানিয়ে ফেলেছি।

এই টক্সিসিটির সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো— ‘কিছু না করার’ তীব্র অপরাধবোধ (Guilt of doing nothing)।

সোফায় শুয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকলে হঠাৎ কেন মনে হয় সময়টা নষ্ট হচ্ছে? কারণ পুঁজিবাদী এই সমাজ আমাদের শিখিয়েছে, সময় মানেই অর্থ। আর সময় নষ্ট করা মানেই ক্ষতি।

মনোবিজ্ঞান বলছে, মানুষের মস্তিষ্কের ‘ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক’ (Default Mode Network) তখনই সক্রিয় হয়, যখন সে কোনো নির্দিষ্ট কাজে মনোযোগ দেয় না। অলস সময়ই হলো সৃজনশীলতা এবং মানসিক নিরাময়ের আসল জায়গা। কিন্তু আমরা সেই অলসতাকেই ভয় পাচ্ছি। ইতালীয় ভাষায় একটা চমৎকার শব্দ আছে— Dolce Far Niente, যার অর্থ “কিছু না করার মাধুর্য”। আমাদের শহুরে জীবনে এই মাধুর্যের জায়গাটা দখল করে নিয়েছে স্ক্রিনের নীল আলো আর ক্যালেন্ডারের নোটিফিকেশন।

আমরা ক্লান্ত হওয়ার অধিকারও হারিয়ে ফেলেছি। এখন ক্লান্ত হলে মনে হয়, আমি অপর্যাপ্ত। আমি অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে পড়ছি।

ফিরে আসি তানভীরের গাড়ির সেই বেসমেন্ট পার্কিংয়ে।

দশ মিনিট শেষ। স্মার্টওয়াচের অ্যালার্ম বাজে। তানভীর গভীর করে একটা শ্বাস নেয়। আয়নায় নিজের ক্লান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে একটা কৃত্রিম হাসি ফোটায়। তারপর গাড়ির দরজা খুলে লিফটের দিকে হাঁটা শুরু করে।

লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত সে একজন সফল ম্যানেজার। কিন্তু লিফটের ভেতরের আয়নায় যে মানুষটা দাঁড়িয়ে থাকে, তার চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা।

আমাদের স্মার্টওয়াচগুলো আমাদের হার্টবিট মাপে, ঘুমের গভীরতা মাপে, পায়ের কদম গুনে রাখে। কিন্তু রাত দুইটায় বিছানায় ছটফট করার সময় মনের ভেতর যে চিৎকারটা বাজে, তার কোনো মেট্রিক্স কোনো অ্যাপে ধরা পড়ে না।

মেডিটেশন অ্যাপগুলো আমাদের শ্বাস নিতে শেখায় ঠিকই, কিন্তু আমাদের শেখায় না কীভাবে নিঃস্বার্থভাবে, কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া শুধু ‘বেঁচে’ থাকতে হয়। তানভীরের গাড়ির ওই দশ মিনিটের নীরবতা হয়তো প্রতিদিন আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটা সহজ সত্য—

মাঝে মাঝে শুধু ‘থাকা’টাই সবচেয়ে বড় কাজ। আর সেই কাজটা করার জন্য কোনো অ্যাপের সাবস্ক্রিপশনের প্রয়োজন হয় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *