বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সার ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের সেবা রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন আরও সহজ ও সুশৃঙ্খল করতে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনায় অনলাইনে সেবা রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রচলিত পণ্য রপ্তানির অনেক প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক আয় দেশে আনা, ব্যাংকে জমা, বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রাখা এবং ব্যয়ের নিয়ম একত্রে স্পষ্ট করা হয়েছে।
নির্দেশনাটি মূলত তথ্যপ্রযুক্তি, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং, সফটওয়্যার, ডেটা প্রসেসিং এবং অন্যান্য অনলাইন পেশাজীবী সেবার মাধ্যমে আয় করা ফ্রিল্যান্সার ও ব্যক্তিগত সেবা রপ্তানিকারকদের জন্য প্রযোজ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ইন্টারনেট বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক মাধ্যমে সেবা রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্য রপ্তানির মতো EXP Form দাখিলের প্রয়োজন হবে না। তবে সেবা রপ্তানির অর্থ দেশে আনা, তা বৈদেশিক মুদ্রা আইনের আওতায় পরিচালনা এবং যথাযথভাবে রিপোর্ট করার বাধ্যবাধকতা থাকবে।
ফ্রিল্যান্সারদের অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত চালান বা শিপিং ডকুমেন্ট থাকে না। তাই ব্যাংকগুলো ই-মেইল, চুক্তিপত্র, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের স্টেটমেন্ট, ডিজিটাল ইনভয়েস, কাজ সম্পন্নের প্রমাণ এবং রেমিট্যান্স বার্তার মতো ইলেকট্রনিক তথ্য যাচাই করে অর্থ গ্রহণের অনুমোদন দিতে পারবে।
ব্যাংকগুলোকে নিশ্চিত হতে হবে যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে ওই ধরনের সেবা দেওয়ার সক্ষমতা ও পেশাগত পরিচয় রাখেন।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, একবারে ২০ হাজার মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ অর্থ পর্যন্ত দেশে এলে Form-C জমা দিতে হবে না।
তবে এর বেশি অর্থ এলে অনলাইন Form-C (ICT) জমা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বের নির্দেশনাও কার্যকর থাকবে।
আন্তর্জাতিক অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে সার্ভিস প্রোভাইডার (ওপিজিএসপি)-এর মাধ্যমে ছোট অঙ্কের সেবা রপ্তানির অর্থ দেশে আনার সুযোগ রাখা হয়েছে।
একটি লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমা হবে ১০ হাজার মার্কিন ডলার। তবে এসব অর্থ বিদেশে কোনো হিসাবে জমা রাখা যাবে না। অনুমোদিত ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো অর্থ বাংলাদেশে আনতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত ব্যাংকগুলোকে যোগ্য ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ডুয়াল কারেন্সি ‘ফ্রিল্যান্সার কার্ড’ ইস্যুর অনুমতি দিয়েছে।
এ ছাড়া মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার বিদেশি পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে ফ্রিল্যান্সারদের অর্থ দেশে আনতে পারবে। অর্থ সরাসরি ডিজিটাল ওয়ালেট বা ব্যাংক হিসাবে জমা হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সফটওয়্যার, ডেটা প্রসেসিং ও অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তি-ভিত্তিক সেবা রপ্তানিকারকরা তাদের নিট রপ্তানি আয়ের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রায় একপোর্টার্স রিটেনশন কোটা (ইআরকিউ) হিসাবে রাখতে পারবেন।
অন্য ধরনের বৈধ সেবা রপ্তানিকারকদের ক্ষেত্রে এই সীমা ৩০ শতাংশ। অবশিষ্ট অর্থ বাধ্যতামূলকভাবে টাকায় রূপান্তর করে স্থানীয় ব্যাংক হিসাবে জমা দিতে হবে।
ইআরকিউ হিসাবে জমা থাকা বৈদেশিক মুদ্রা বিভিন্ন বৈধ আন্তর্জাতিক ব্যয়ে ব্যবহার করা যাবে। এর মধ্যে রয়েছে— বিদেশ ভ্রমণ, সফটওয়্যার নিবন্ধন, ডোমেইন ও হোস্টিং ফি, সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি এবং অনুমোদিত ব্যক্তিগত বৈদেশিক ব্যয় ।
ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী কর কর্তন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নো ইয়োর কাস্টমার (কেওয়াইসি), এন্টি-মানি লন্ডারিং (এএমএল) এবং কমবাটিং দ্য ফিনান্সিং অফ টেররিজম (সিএফটি)-সংক্রান্ত সব নিয়ম মেনে লেনদেন পরিচালনা করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, অনুমোদিত নোশনাল বা মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ছাড়া বিদেশে কোনো ব্যাংক হিসাব, সম্পদ বা ভার্চুয়াল সম্পদে সেবা রপ্তানির অর্থ রেখে দেওয়া যাবে না। এটি ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন এক্ট,১৯৪৭ এর লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
সেবা রপ্তানি থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রাও পণ্য রপ্তানির মতো নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই দেশে আনতে হবে। একই সঙ্গে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোকে প্রতিটি লেনদেন যথাযথ উদ্দেশ্য কোড ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংকে রিপোর্ট করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ করতে হবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে কয়েক লাখ ফ্রিল্যান্সার আন্তর্জাতিক বাজারে সফটওয়্যার উন্নয়ন, গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট রাইটিং, ভিডিও এডিটিং, ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্স, ডেটা প্রসেসিংসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা রপ্তানি করছেন। দীর্ঘদিন ধরে আয়ের প্রমাণ, ব্যাংকিং প্রক্রিয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ নিয়ে নানা ধরনের বাস্তব জটিলতা ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সমন্বিত নির্দেশনা এসব বিষয়ে একটি অভিন্ন নীতিমালা তৈরি করেছে। এর ফলে ফ্রিল্যান্সারদের বৈদেশিক আয় দেশে আনা, ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণ এবং বৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও সহজ হবে।