বাংলা গানের কিংবদন্তি গাজী মাজহারুল আনোয়ারকে স্মরণ করল কুমিল্লা

কুমিল্লা শহরে কিংবদন্তি গীতিকার, সুরকার ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক গাজী মাজহারুল আনোয়ারকে স্মরণ করে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘স্মৃতিতে গাজী মাজহারুল আনোয়ার গীতাঞ্জলি’। দেশাত্মবোধ, স্মৃতি ও সংগীতের আবহে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তাঁর জীবন, কর্ম এবং বাংলা সংগীতে অসামান্য অবদান তুলে ধরা হয়।

শনিবার (২৫শে জুলাই) সন্ধ্যায় নগরীর কান্দিরপাড় টপটেন ভবনের চতুর্থ তলায় গ্র্যান্ড দেশপ্রিয় কনভেনশন হলে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কুমিল্লা অধুনা থিয়েটার। আয়োজনের উদ্যোগ নেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. শহীদুল হক স্বপন। অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ছিল গাজী মাজহারুল আনোয়ারের জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গান একতারা তুই দেশের কথা বল’।

অনুষ্ঠান শুরুর আগেই মিলনায়তন ভরে যায় সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, সাংবাদিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দর্শকে। মঞ্চে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের আলোকচিত্র এবং তাঁর গানকে কেন্দ্র করে সাজানো পরিবেশ পুরো আয়োজনকে স্মরণীয় করে তোলে।

অনুষ্ঠানে গাজী মাজহারুল আনোয়ারকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন সুরকার শেখ সাদী খান, তাঁর সহধর্মিণী জোহরা গাজী, ছোট ভাই ইমরুল আনোয়ার লিটন এবং ছেলে সরফরাজ আনোয়ার (উপল)। বক্তারা তাঁর শিল্পীসত্তার পাশাপাশি একজন দেশপ্রেমিক, বিনয়ী ও মানবিক মানুষ হিসেবে তাঁর ব্যক্তিত্বের কথা তুলে ধরেন।

বিশেষ পরিবেশনায় অংশ নেন গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কন্যা ও সংগীতশিল্পী দিঠি আনোয়ার। বাবার লেখা গান পরিবেশন করতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। উপস্থিত দর্শকরাও করতালির মাধ্যমে তাঁর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আহ্বায়ক প্রফেসর মো. জামাল নাছের এবং শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সদস্য সচিব রাশেদুল করিম সজীব। সভাপতিত্ব করেন অধুনা থিয়েটারের সভাপতি অধ্যক্ষ কবির আহমেদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন অ্যাডভোকেট মো. শহীদুল হক স্বপন।

সাংস্কৃতিক পর্বে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের জনপ্রিয় গান পরিবেশন করেন খিজির হায়াত টিপু, ইমরান মাসুদ, নাজনীন কাজল, শিউলী রায়, ইশতিয়াক আহমেদ পল্লব, কামাল খান, অনামিকা দেব ও সুষ্মিতা রায়। ‘আমার এই মন আমি’, ‘তোমারই পরশে’, ‘ইশারায় শিস দিয়ে’, ‘গানের খাতায় স্বরলিপি’, ‘পিচঢালা এই পথটারে’, ‘ভেঙেছে পিঞ্জর’, ‘পারিনা ভুলে যেতে’ এবং ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’সহ একের পর এক জনপ্রিয় গান পরিবেশিত হলে দর্শকরা শিল্পীদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান।

বক্তারা বলেন, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের গান শুধু বিনোদনের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম, ভালোবাসা এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁরা নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও সৃষ্টিকে তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

১৯৪৩ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে জন্মগ্রহণ করেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। প্রায় ছয় দশকের কর্মজীবনে তিনি ২০ হাজারের বেশি গান রচনা করেন। বিবিসি বাংলার সর্বকালের সেরা বাংলা গানের তালিকায় তাঁর লেখা তিনটি গান—‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বল’ এবং ‘একবার যেতে দে না’—স্থান পেয়েছে। তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও কাজ করেছেন এবং একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার, পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

২০২২ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর ৭৯ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তবে তাঁর গান ও সৃষ্টিশীল অবদান আজও বাংলা সংগীতের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।

আয়োজকদের মতে, ‘স্মৃতিতে গাজী মাজহারুল আনোয়ার গীতাঞ্জলি’ শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং বাংলা গানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্রষ্টার প্রতি সম্মান, কৃতজ্ঞতা এবং তাঁর সৃষ্টিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি প্রয়াস।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *