ভক্তি, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির বার্তায় শেষ হলো উল্টো রথযাত্রার নয় দিনের মহোৎসব

“জয় জগন্নাথ” ধ্বনি, শঙ্খ, ঘণ্টা, করতাল ও মহাহরিনাম সংকীর্তনের সুরে বৃহস্পতিবার (২৩শে জুলাই) কুমিল্লা নগরী পরিণত হয় এক বিশাল ধর্মীয় উৎসবের মিলনমেলায়। শ্রী শ্রী জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রাদেবীর উল্টো রথযাত্রায় অংশ নিতে কুমিল্লাসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থী জড়ো হন। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় নয় দিনব্যাপী রথযাত্রা মহোৎসব।

দুপুরের পর থেকেই নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও মন্দির প্রাঙ্গণে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। ফুল, আলোকসজ্জা ও বর্ণিল সাজে সজ্জিত রথ এবং মন্দির উৎসবকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সের মানুষ ভক্তিভরে অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি উৎসবটি সম্প্রীতি ও সামাজিক সহাবস্থানেরও এক বড় উদাহরণ হয়ে ওঠে।

জগন্নাথপুর শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের মন্দির এবং ঠাকুরপাড়াস্থ শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ গৌর-নিতাই মন্দিরভিত্তিক আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) কুমিল্লার যৌথ উদ্যোগে দিনব্যাপী পূজার্চনা, অগ্নিহোত্র যজ্ঞ, মহাহরিনাম সংকীর্তন, ধর্মসভা, শোভাযাত্রা এবং মহাপ্রসাদ বিতরণের আয়োজন করা হয়।

সকালে গুন্ডিচা মন্দিরে পূজা, দর্শন-আরতি, বিশ্বশান্তি কামনায় যজ্ঞ, ভজন-কীর্তন এবং প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। আয়োজকদের ভাষ্য, কুমিল্লার বাইরে থেকেও বিপুলসংখ্যক ভক্ত অনুষ্ঠানে যোগ দেন। অনেকেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে জগন্নাথদেবের দর্শন করেন এবং মহাপ্রসাদ গ্রহণ করেন।

দুপুরে অনুষ্ঠিত ধর্মসভায় ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কুমিল্লা সদর আসনের সংসদ সদস্য মো. মনিরুল হক চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ইউসূফ মোল্লা টিপু, কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান উৎবাতুল বারী আবু, জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া, কুমিল্লা (দক্ষিণ) জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম প্রমুখ। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ইসকনের সিনিয়র সহ-সভাপতি শ্রী শ্রীমৎ ভক্তি অদ্বৈত নবদ্বীপ স্বামী মহারাজ আশীর্বাদক হিসেবে বক্তব্য দেন। উদ্বোধন করেন ইসকনের সাধারণ সম্পাদক শ্রী শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী মহারাজ।

ধর্মসভা শেষে শুরু হয় বহু প্রতীক্ষিত উল্টো রথযাত্রা। হাজারো ভক্ত রথের রশি ধরে নগরীর প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। “হরে কৃষ্ণ, হরে রাম” এবং “জয় জগন্নাথ” ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। করতাল, মৃদঙ্গ ও শঙ্খধ্বনির সঙ্গে এগিয়ে চলে সুসজ্জিত রথ। সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে অসংখ্য মানুষ এই দৃশ্য উপভোগ করেন। কেউ মোবাইল ফোনে মুহূর্তগুলো ধারণ করেন, আবার কেউ রথকে প্রণাম জানান।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, রথের রশি স্পর্শ করা বা রথ টানার সুযোগ পাওয়া সৌভাগ্যের প্রতীক। সেই বিশ্বাস থেকেই নারী-পুরুষ, শিশু, তরুণ ও প্রবীণ সবাই উৎসাহের সঙ্গে রথ টানায় অংশ নেন। অনেকের মুখে ছিল আবেগ, আনন্দ ও গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতির ছাপ।

শোভাযাত্রায় বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ অংশ নেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের অংশগ্রহণ উৎসবটিকে আরও সর্বজনীন করে তোলে।

বক্তারা উল্টো রথযাত্রার ধর্মীয় তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, রথযাত্রার সময় জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রাদেবী মূল মন্দির থেকে গুন্ডিচা মন্দিরে গমন করেন। নির্ধারিত সময় শেষে উল্টো রথযাত্রার মাধ্যমে তাঁদের পুনরায় মূল মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়। এই প্রত্যাবর্তনই উল্টো রথযাত্রা হিসেবে উদযাপিত হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, এই উৎসবে অংশগ্রহণ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে শান্তি ও কল্যাণ বয়ে আনে।

ইসকন কুমিল্লার সভাপতি শ্রী সুকান্ত চক্রবর্তী (সুদর্শন জগন্নাথ দাস ব্রহ্মচারী) বলেন, রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি ভক্তি, মানবকল্যাণ, সম্প্রীতি এবং বিশ্বশান্তির বার্তা বহন করে। তাঁর ভাষায়, বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণই বাংলাদেশের সামাজিক সম্প্রীতির শক্তিকে আরও দৃঢ় করে।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পুরো উৎসবকে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল রাখতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকেরাও সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন। ফলে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই উৎসব সম্পন্ন হয়।

নয় দিনের রথযাত্রা মহোৎসবজুড়ে পূজার্চনা, ধর্মসভা, মহাহরিনাম সংকীর্তন, ভজন-কীর্তন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মহাপ্রসাদ বিতরণের মাধ্যমে ভক্তদের মধ্যে ধর্মীয় চেতনা, মানবসেবা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও বিশ্বশান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

দিনের শেষে যখন জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রাদেবীর রথ আবার নিজ মন্দিরে ফিরে আসে, তখন ভক্তদের কণ্ঠে আবারও ধ্বনিত হয়—”জয় জগন্নাথ”। অনেকের কাছে এটি শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং নতুন আশীর্বাদ, নতুন আশা এবং সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক। কুমিল্লার এবারের উল্টো রথযাত্রা তাই ভক্তি ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি বহুত্ববাদী সমাজে সহাবস্থান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের একটি দৃশ্যমান প্রকাশ হিসেবেও গুরুত্ব পেয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *