আমজাদ সুমন
বিশ্বখ্যাত পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন চলচ্চিত্র দ্য ওডিসি মুক্তির আগেই যেমন আলোচনার কেন্দ্রে ছিল, মুক্তির পরও সেটিকে ঘিরে বিতর্ক থামছে না। হোমারের আড়াই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো মহাকাব্যকে আধুনিক চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়ার এই প্রচেষ্টা প্রশংসার পাশাপাশি তীব্র সমালোচনাও কুড়িয়েছে।
সম্প্রতি ব্রিটিশ সাময়িকী দি ইকোনমিস্ট-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে নোলানের এই অভিযোজনকে “একটি মহাকাব্যিক ভুল” বলে অভিহিত করা হয়েছে। তাদের দাবি, চলচ্চিত্রটি প্রাচীন গ্রিক সমাজ ও সংস্কৃতির চেয়ে আধুনিক পশ্চিমা সমাজের মূল্যবোধ, রাজনীতি এবং মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই বেশি তুলে ধরেছে।
ছবিটি মুক্তির আগে প্রকাশিত ট্রেলার থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা বিতর্ক শুরু হয়।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল হেলেন চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রীর নির্বাচন। দর্শকদের একাংশ অভিযোগ করেন, ঐতিহাসিক চরিত্রের সঙ্গে অভিনেত্রীর বর্ণগত পরিচয়ের মিল নেই। যদিও অনেকেই এটিকে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক বলেও উড়িয়ে দিয়েছেন।
এছাড়া ওডিসিয়াসের হেলমেটের পালকের রঙ, সৈন্যদের বর্মের নকশা এবং পুরো ভিজ্যুয়াল ডিজাইন নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। অনেকের মতে, এগুলো প্রাচীন গ্রিসের পরিবর্তে আধুনিক সুপারহিরো চলচ্চিত্রের আবহ তৈরি করেছে।
আরও একটি বিষয় নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়। ট্রেলারে ওডিসিয়াসের ছেলে বাবাকে সম্বোধন করতে “ড্যাড” শব্দ ব্যবহার করে। সমালোচকদের মতে, এমন আধুনিক ভাষা প্রাচীন গ্রিক মহাকাব্যের পরিবেশের সঙ্গে মানানসই নয়। ইউটিউবে এক দর্শক মন্তব্য করেন, “বিমানেও যদি এই সিনেমা দেখানো হয়, আমি হেঁটে নেমে যাব।”
দি ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণের মূল সমালোচনা এসেছে ওডিসিয়াস চরিত্রকে ঘিরে।
হোমারের মহাকাব্যে ওডিসিয়াস একজন জটিল, বুদ্ধিমান এবং একই সঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ নায়ক। তিনি কখনও নির্মম, কখনও কৌশলী, আবার কখনও আত্মকেন্দ্রিক। এই বহুমাত্রিক চরিত্রই মহাকাব্যের অন্যতম শক্তি।
কিন্তু সমালোচকদের মতে, নোলানের চলচ্চিত্রে সেই জটিলতা অনেকটাই সরিয়ে দিয়ে তাকে একজন আধুনিক, নৈতিকভাবে প্রায় নিখুঁত নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, চরিত্রটির কিছু বিতর্কিত আচরণকে কখনও মাদকাসক্তির প্রভাব, আবার কখনও আধুনিক ভাষায় মানসিক আঘাত বা “প্রোটো-পিটিএসডি”-এর ব্যাখ্যায় তুলে ধরা হয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, হাজার হাজার বছর আগের একটি মহাকাব্যকে কি আজকের মনোবিজ্ঞানের ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা উচিত?
চলচ্চিত্রের শেষ অংশও সমালোচনার মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ছবিতে ওডিসিয়াসকে যেভাবে তীরবিদ্ধ অবস্থায় দেখানো হয়েছে, তা খ্রিস্টান ঐতিহ্যের সেন্ট সেবাস্তিয়ানের চিত্রের সঙ্গে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। তাদের মতে, এই দৃশ্য হোমারের মূল কাহিনির ভাবধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এটি চলচ্চিত্রের সবচেয়ে দুর্বল অংশগুলোর একটি।
সমালোচকদের বড় প্রশ্ন হলো, নোলানের দ্য ওডিসি আসলে কতটা হোমারের মহাকাব্যের গল্প বলেছে, আর কতটা আধুনিক বিশ্বের মূল্যবোধকে সেখানে প্রতিফলিত করেছে।
তাদের মতে, ছবিটিতে রাজনৈতিক সঠিকতা, সমসাময়িক সামাজিক সংবেদনশীলতা এবং আধুনিক মানসিক বিশ্লেষণের প্রভাব এতটাই প্রবল যে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার নিজস্ব চিন্তা ও সংস্কৃতি অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে।
অন্যদিকে চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের আরেকটি অংশের মত ভিন্ন। তাদের মতে, সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ মানেই হুবহু অনুবাদ নয়। একজন নির্মাতা নিজের সময়, দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিল্পবোধের আলোকে গল্পকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার স্বাধীনতা রাখেন। ফলে নোলানের এই পরিবর্তনগুলোকে অনেকেই সৃজনশীল ব্যাখ্যা হিসেবেও দেখছেন।
বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী মহাকাব্য দ্য ওডিসি নিয়ে কাজ করা যে সহজ নয়, তা এই বিতর্কই আবারও মনে করিয়ে দিল।
নোলানের চলচ্চিত্র শেষ পর্যন্ত দর্শকদের কাছে আধুনিক এক ক্লাসিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবে, নাকি সমালোচকদের ভাষায় “মহাকাব্যিক ভুল” হিসেবেই আলোচিত থাকবে—সেই মূল্যায়ন সময়ই করবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, প্রাচীন সাহিত্যকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার প্রতিটি প্রচেষ্টাই শুধু শিল্প নয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সমসাময়িক মূল্যবোধ নিয়েও নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। দ্য ওডিসি সেই দীর্ঘ বিতর্কের সর্বশেষ এবং সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ।