হিটলারের জন্মভবন এখন পুলিশ স্টেশন: ইতিহাস মুছে ফেলা, নাকি ইতিহাসের মুখোমুখি হওয়া?

অস্ট্রিয়ার ছোট সীমান্ত শহর ব্রাউনাউ অ্যাম ইন। এখানকার একটি সাধারণ ভবনই বহন করে বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি স্মৃতি। ১৮৮৯ সালের ২০শে এপ্রিল এই ভবনেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলার। প্রায় দেড় শতাব্দী পর সেই ভবনই এখন নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। ২০২৬ সালের ২২শে জুলাই অস্ট্রিয়া সরকার সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি পুলিশ স্টেশন উদ্বোধন করেছে।

এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান ঘটলেও নতুন করে শুরু হয়েছে আরেকটি বিতর্ক। ইতিহাসের এমন একটি স্থাপনা কি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ভবন হওয়া উচিত, নাকি এটি শিক্ষা ও স্মৃতিচর্চার কেন্দ্র হিসেবে সংরক্ষণ করা উচিত— সেই প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।

হিটলারের জন্মভবনটি অস্ট্রিয়ার আপার অস্ট্রিয়া অঙ্গরাজ্যের ব্রাউনাউ অ্যাম ইন শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত। জার্মান সীমান্তের খুব কাছেই এর অবস্থান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ভবনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। আশঙ্কা ছিল, এটি নব্য-নাৎসি ও চরমপন্থীদের জন্য তীর্থস্থানে পরিণত হতে পারে।

১৯৭২ সাল থেকে অস্ট্রিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভবনটি ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ দেয়। সর্বশেষ সেখানে একটি প্রতিবন্ধী সহায়তা কেন্দ্র পরিচালিত হয়। তবে ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠানটি সরে গেলে ভবনটি দীর্ঘদিন খালি পড়ে থাকে।

ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবনটি কিনতে সরকারের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর ২০১৬ সালে অস্ট্রিয়ার সংসদ বিশেষ আইন পাস করে ভবনটি অধিগ্রহণ করে।

মালিক এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যান। তবে ২০১৭ সালে অস্ট্রিয়ার সর্বোচ্চ আদালত সরকারের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। ভবনটি ভেঙে ফেলার প্রস্তাবও আলোচনায় আসে। কিন্তু ইতিহাসবিদ, সংরক্ষণবিদ ও আন্তর্জাতিক মহলের আপত্তির মুখে সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়।

প্রায় ২ কোটি ইউরো ব্যয়ে ভবনটির ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে। স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান মার্টে.মার্টে আর্কিটেক্টস এই প্রকল্পের নকশা করে।

সংস্কারের সময় ভবনটির বহিরাংশকে ১৮ শতকের ঐতিহাসিক রূপের কাছাকাছি ফিরিয়ে নেওয়া হয়। নাৎসি আমলে যুক্ত হওয়া কিছু স্থাপত্য উপাদান অপসারণ করা হয়েছে। ভবনের রংও পরিবর্তন করা হয়েছে।

এখন এখানে শুধু একটি পুলিশ স্টেশনই নয়, জেলা পুলিশ সদর দপ্তর এবং পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমির একটি শাখাও পরিচালিত হবে। প্রশিক্ষণে মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সাংবিধানিক দায়িত্বের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছে সরকার।

অস্ট্রিয়া সরকারের ভাষ্য, এই ভবনকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যার কাজ আইন, গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করা।

সরকারের মতে, ভবনটিকে স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করলে এটি ধীরে ধীরে চরমপন্থীদের প্রতীকী আকর্ষণ হারাবে। অর্থাৎ ভবনটিকে “নিরপেক্ষ” করা হবে।

তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অস্ট্রিয়ায় মতভেদ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা সিবিল ট্রেইবলমেয়ার মনে করেন, পুলিশ স্টেশন হওয়ায় নব্য-নাৎসিদের সমাবেশ কমতে পারে। তবে ভবনটির আরও অর্থবহ ব্যবহার সম্ভব ছিল।

মাউটহাউজেন কমিটির প্রতিনিধি লুডভিগ লাহেরের মতে, ভবনটিকে শান্তি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে তা আরও কার্যকর হতো। তিনি বলেন, একটি পুলিশ স্টেশন রাষ্ট্রের ক্ষমতার প্রতীক। অথচ এই স্থানটি হওয়া উচিত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রতীক।

ইতিহাসবিদ ফ্লোরিয়ান কোটাঙ্কোও সরকারের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ভবনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট যথাযথভাবে তুলে ধরা হচ্ছে না। কেবল বাহ্যিক পরিবর্তন করে ইতিহাসের স্মৃতি মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে অনেক স্থানীয় বাসিন্দা সরকারের সিদ্ধান্তকে বাস্তবসম্মত বলে মনে করছেন। তাঁদের বিশ্বাস, এতে ভবনটি আর চরমপন্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হবে না।

ভবনের সামনে বহু বছর ধরে একটি স্মৃতিফলক রয়েছে। সেখানে লেখা আছে—

“শান্তি, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য। আর কখনো ফ্যাসিবাদ নয়। কোটি কোটি মৃত্যু আমাদের সতর্ক করছে।”

সরকার জানিয়েছে, এই স্মৃতিফলক অপরিবর্তিত থাকবে।

১৯৩৮ সালে অস্ট্রিয়া নাৎসি জার্মানির সঙ্গে সংযুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে দেশটির প্রায় ৬৫ হাজার ইহুদি নিহত হন এবং প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হন।

দীর্ঘ সময় ধরে অস্ট্রিয়া নিজেকে নাৎসি আগ্রাসনের প্রথম শিকার হিসেবে তুলে ধরেছিল। পরে দেশটি ধীরে ধীরে হলোকাস্টে নিজের ভূমিকা ও দায় স্বীকার করতে শুরু করে। তবুও অতীতের এই অধ্যায় নিয়ে বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রাউনাউ অ্যাম ইন শহরে নাৎসি-সংশ্লিষ্ট দুটি রাস্তার নামও পরিবর্তন করা হয়েছে। এটি অতীতের সঙ্গে নতুনভাবে সম্পর্ক নির্ধারণের একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

হিটলারের জন্মভবনকে পুলিশ স্টেশনে রূপান্তরের মাধ্যমে অস্ট্রিয়া একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে। ভবনটি যেন আর কোনো চরমপন্থী মতাদর্শের প্রতীক না হয়।

তবে সমালোচকদের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের বিতর্কিত স্থানকে সাধারণ প্রশাসনিক ভবনে পরিণত করলেই কি তার অতীত মুছে যায়? নাকি সেই স্থানকে শিক্ষা, গবেষণা ও গণসচেতনতার কেন্দ্র বানানোই ইতিহাসের প্রতি আরও দায়িত্বশীল আচরণ?

ব্রাউনাউ অ্যাম ইন-এর এই ভবন তাই এখন শুধু একটি পুলিশ স্টেশন নয়। এটি স্মৃতি, ইতিহাস, রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা এবং অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সম্পর্ক নিয়ে চলমান আন্তর্জাতিক বিতর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *