৫৩ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছে সুপারসনিক বিমান, আসছে এয়ার ট্যাক্সির যুগ

এক সময় মনে করা হতো, শব্দের চেয়ে দ্রুতগতির যাত্রীবাহী বিমান (সুপারসনিক) হয়তো ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। কনকর্ডের বিদায়ের পর সেই ধারণাই আরও শক্ত হয়েছিল। কিন্তু এখন আবার বদলাচ্ছে সেই চিত্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি নীতিগত পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে, যা শুধু সুপারসনিক বিমানই নয়, ভবিষ্যতের উড়ন্ত ট্যাক্সি বা এয়ার ট্যাক্সির যুগও বাস্তবে নিয়ে আসতে পারে।

মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) এমন একটি নতুন নিয়ম প্রস্তাব করেছে, যা কার্যকর হলে ৫৩ বছর ধরে চালু থাকা সুপারসনিক উড়ানের নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটবে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক উড়ন্ত ট্যাক্সি (eVTOL) প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহারের পথও আরও পরিষ্কার হবে।

১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার দেশের স্থলভাগের ওপর দিয়ে বেসামরিক সুপারসনিক বিমানের উড়ান নিষিদ্ধ করে। কারণ ছিল “সোনিক বুম”—শব্দের বেগ অতিক্রম করার সময় তৈরি হওয়া প্রচণ্ড শব্দের তরঙ্গ।

সেই সময় পরীক্ষামূলক উড়ানের কারণে অনেক এলাকায় জানালার কাচ ভেঙে যাওয়া, ভবন কেঁপে ওঠা এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছিল। ফলে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, যাত্রীবাহী কোনো বিমান যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে শব্দের বেগ অতিক্রম করতে পারবে না।

এ কারণেই কনকর্ডের মতো সুপারসনিক বিমানও যুক্তরাষ্ট্রের স্থলভাগের ওপর দিয়ে উড়ার সময় গতি কমিয়ে আনতে বাধ্য হতো।

এফএএ এখন আর বিমানের গতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। বরং তারা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় শব্দের মাত্রা।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, যদি কোনো সুপারসনিক বিমান এমনভাবে নকশা করা হয় যাতে তার সোনিক বুম ভূপৃষ্ঠে খুব কম অনুভূত হবে, তাহলে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের স্থলভাগের ওপর দিয়েও শব্দের বেগের চেয়ে দ্রুত উড়তে পারবে।

এর জন্য সর্বোচ্চ শব্দচাপের একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। আধুনিক বিমান নকশা, উন্নত উপাদান এবং “ম্যাক কাটঅফ” প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে মনে করছে এফএএ। এই প্রযুক্তিতে বিমানের উচ্চতা, গতি এবং বায়ুমণ্ডলের অবস্থা এমনভাবে সমন্বয় করা হয়, যাতে সোনিক বুমের শক্তি ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানোর আগেই দুর্বল হয়ে যায়।

মার্কিন পরিবহন সচিব শন ডাফি বলেছেন, সুপারসনিক বিমান ফিরিয়ে আনা শুধু দ্রুত ভ্রমণের বিষয় নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার একটি পদক্ষেপ।

এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উড়ন্ত ট্যাক্সি বা ইলেকট্রিক ভার্টিক্যাল টেকঅফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং (eVTOL) প্রযুক্তি।

এই ধরনের বিমান হেলিকপ্টারের মতো উল্লম্বভাবে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে, কিন্তু উড়ে চলে বিমানের মতো। এগুলো সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক হওয়ায় শব্দও তুলনামূলকভাবে কম এবং স্বল্প দূরত্বে দ্রুত যাতায়াতের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।

২০২৬ সালের গ্রীষ্ম থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ২৬টি অঙ্গরাজ্যে পরীক্ষামূলকভাবে এই এয়ার ট্যাক্সি পরিচালনা শুরু হয়েছে। জোবি এভিয়েশন, আর্চার এভিয়েশন এবং বিটা টেকনোলজিসের মতো প্রতিষ্ঠান এ প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে।

বর্তমান নকশা অনুযায়ী, একটি এয়ার ট্যাক্সিতে একজন পাইলট এবং চারজন যাত্রী ভ্রমণ করতে পারবেন। এগুলোর গতি ঘণ্টায় প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ মাইল এবং একবার চার্জে প্রায় ২০ মাইল পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য এগুলো পরিকল্পিত।

তবে এই ঘোষণা মানেই আগামী বছর থেকেই সুপারসনিক বিমানে যাত্রী পরিবহন শুরু হচ্ছে—এমনটি নয়।

এফএএ-এর প্রস্তাবিত নিয়মটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এটি প্রকাশের পর জনমত গ্রহণের জন্য ৪৫ দিনের সময় রাখা হয়েছে। সেই মতামত পর্যালোচনা করে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি চূড়ান্ত নিয়ম প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।

এরপরও বিমান নির্মাতাদের নতুন বিমান তৈরি, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং সার্টিফিকেশন সম্পন্ন করতে সময় লাগবে।

বর্তমানে ডেনভারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বুম সুপারসনিক তাদের ওভারচার নামে নতুন প্রজন্মের সুপারসনিক যাত্রীবাহী বিমান তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য দশকের শেষ দিকে বাণিজ্যিক যাত্রী পরিবহন শুরু করা। অর্থাৎ অন্তত আগামী কয়েক বছর সাধারণ যাত্রীদের জন্য সুপারসনিক বিমান চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

নিয়ম পরিবর্তনের পাশাপাশি বিষয়টি আইনগতভাবেও এগোচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ সুপারসনিক এভিয়েশন মর্ডারনাইজেশন এক্ট পাস করেছে। বিলটি এখন সিনেটের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালের জুনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প “লিডিং দ্য ওয়ার্ল্ড ইন সুপারসনিক ফ্লাইট শীর্ষক একটি নির্বাহী আদেশে এফএএ-কে নতুন নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেন।

তবে এই নিয়ম শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমার জন্য প্রযোজ্য হবে। আন্তর্জাতিক রুটে সুপারসনিক বিমান পরিচালনার জন্য অন্যান্য দেশের বিমান নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ও পৃথক চুক্তি প্রয়োজন হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নীতিগত পরিবর্তন শুধু একটি পুরোনো নিষেধাজ্ঞার অবসান নয়; এটি ভবিষ্যতের বিমান পরিবহনের দিকনির্দেশনা বদলে দিতে পারে।

যদি প্রযুক্তি প্রত্যাশামতো সফল হয়, তাহলে আগামী দশকে নিউইয়র্ক থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন শহরের মধ্যে যাত্রার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। পাশাপাশি শহরের অভ্যন্তরীণ যাতায়াতে এয়ার ট্যাক্সি নতুন এক পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

অর্থাৎ, সুপারসনিক বিমান ও উড়ন্ত ট্যাক্সি এখনো ভবিষ্যতের প্রযুক্তি হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক এই নীতিগত পরিবর্তন সেই ভবিষ্যৎকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তব করে তুলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *