হারের হতাশা থেকে হাতাহাতি: আর্জেন্টিনার আচরণে ক্ষুব্ধ ফুটবল বিশ্ব

বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো মর্যাদাপূর্ণ একটি ম্যাচের সমাপ্তি সাধারণত বিজয়ীর উল্লাস আর পরাজিত দলের হতাশার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেনের কাছে ১–০ গোলে হারের পর আর্জেন্টিনা দলের কিছু খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফের আচরণ সেই স্বাভাবিক চিত্রকে ছাপিয়ে গেছে। ম্যাচ শেষে মাঠে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষ এবং পদক বিতরণী অনুষ্ঠানের আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার তদন্ত শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।

রবিবারের ফাইনালে শেষ বাঁশি বাজতেই স্পেনের খেলোয়াড় ও বদলি সদস্যরা মাঠে নেমে শিরোপা জয়ের উদযাপন শুরু করেন। ঠিক তখনই আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড় তাদের দিকে এগিয়ে যান এবং পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস। তিনি স্পেনের ডিফেন্ডার এরিক গার্সিয়ার গলা ধরে তাকে মাটিতে ফেলে দেন। পরে স্পেনের মিডফিল্ডার গাভির সঙ্গেও তার সংঘর্ষ হয়। গাভিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া এবং মুখে আঘাত করার অভিযোগও উঠেছে পারেদেসের বিরুদ্ধে। ম্যাচ-পরবর্তী এই আচরণের জন্য রেফারি তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান।

এ সময় আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার নাহুয়েল মোলিনাকেও স্পেনের অধিনায়ক রদ্রির দিকে আক্রমণাত্মকভাবে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসা খেলোয়াড়দের সঙ্গেও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে।

তদন্ত শুধু খেলোয়াড়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ রবের্তো আয়ালার বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে তাকে এরিক গার্সিয়ার গলা চেপে ধরতে এবং স্পেনের মিডফিল্ডার দানি ওলমোর সঙ্গে শারীরিক সংঘর্ষে জড়াতে দেখা গেছে ।

এ ছাড়া আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার নিকোলাস ওটামেন্দিকেও ম্যাচ শেষে রদ্রির সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে জড়াতে দেখা যায়।

ঘটনার পর ফুটবল বিশ্লেষক, সাবেক খেলোয়াড় এবং ধারাভাষ্যকাররা কঠোর ভাষায় আর্জেন্টিনার আচরণের সমালোচনা করেছেন।

ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার অ্যালান শিয়ারার বলেন, মাঠে যেভাবে পারেদেস প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হয়েছেন, তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।

ধারাভাষ্যকার আরন সিকায়া ঘটনাটিকে “স্ট্রেট থাগারি” বা সরাসরি দুর্বৃত্তায়ন হিসেবে উল্লেখ করেন। সিএনএনের উপস্থাপক জিম স্কিউটো একে “সম্পূর্ণ জঘন্য” বলে মন্তব্য করেন। ফক্স সকার বিশ্লেষক অ্যালেক্সি লালাসের ভাষায়, এমন আচরণ একজন পেশাদার ফুটবলারের সঙ্গে মানানসই নয়।

বিবিসির বিশ্লেষক ও সাবেক গোলরক্ষক জো হার্ট পুরো ঘটনাকে “জঘন্য আচরণ” বলে আখ্যায়িত করেন।

ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ওয়েইন রুনি বলেন, পরাজয়ের পর এ ধরনের প্রতিক্রিয়া হতাশাজনক। তার মতে, ম্যাচ হারলে সেটি মেনে নিয়ে সম্মানজনকভাবে মাঠ ছেড়ে যাওয়াই একজন পেশাদার খেলোয়াড়ের দায়িত্ব।

সাবেক ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিল পারেদেসের আচরণকে “লজ্জাজনক” বলে মন্তব্য করেন। আর ধারাভাষ্যকার অ্যাড্রিয়ান ডারহাম বলেন, এমন আচরণ ফুটবলের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর।

বিতর্ক শুধু মাঠের সংঘর্ষেই শেষ হয়নি। রৌপ্যপদক গ্রহণের পর আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড়, যার মধ্যে লিওনেল মেসিও, স্পেনের ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মুর্হূতে অনুষ্ঠানস্থলে পেছন ফিরে দাড়িয়ে ছিলেন ।

অনেক সাবেক খেলোয়াড় ও বিশ্লেষক এই আচরণকে খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, পরাজয় মেনে নিয়ে প্রতিপক্ষকে সম্মান জানানো আন্তর্জাতিক ফুটবলের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।

ফুটবলীয় লড়াইয়ের চেয়ে শেষ বাঁশির পরের ঘটনাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ফিফা পুরো ঘটনার ভিডিও, ম্যাচ কর্মকর্তাদের প্রতিবেদন এবং অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা করছে।

তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় বা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো একটি আসরের সমাপ্তিতে এমন ঘটনা আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব ও ক্রীড়াসুলভ মানসিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *