ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার স্যার গারফিল্ড সোবার্স আর নেই

বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে এক স্বর্ণালী অধ্যায়ের অবসান ঘটল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার স্যার গারফিল্ড স্ট অব্রান সোবার্স মারা গেছেন।  ১৭ই জুলাই বার্বাডোজের নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। আর মাত্র ১১ দিন পরই তিনি ৯০ বছরে পা রাখার কথা ছিল।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড এক বিবৃতিতে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটির সভাপতি কিশোর শ্যালো বলেন, ক্রিকেট ইতিহাসে অনেক মহান খেলোয়াড় এসেছেন, কিন্তু স্যার গারফিল্ড সোবার্স ছিলেন এমন একজন, যিনি মহানতার সংজ্ঞাকেই নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর মতে, সোবার্সই বিশ্বের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার।

১৯৩৬ সালের ২৮শে জুলাই বার্বাডোজের ব্রিজটাউনে জন্মগ্রহণ করেন গারফিল্ড সোবার্স। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তার প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয়। এক বছরের মধ্যেই, ১৯৫৪ সালে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় দলে জায়গা করে নেন। এরপর টানা দুই দশক, ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যান।

টেস্ট ক্রিকেটে তিনি খেলেছেন ৯৩টি ম্যাচ। করেছেন ৮ হাজার ৩২ রান, গড় ৫৭.৭৮। তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ২৬টি শতক। বল হাতে নিয়েছেন ২৩৫টি উইকেট। পাশাপাশি অসাধারণ ফিল্ডিংয়ের মাধ্যমে নিয়েছেন ১০৯টি ক্যাচ।

১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে কিংস্টনে ৩৬৫ রানে অপরাজিত থেকে সোবার্স গড়েছিলেন নতুন বিশ্ব রেকর্ড। সেই সময় এটি ছিল টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। টানা ৩৬ বছর রেকর্ডটি অক্ষুণ্ন ছিল। ১৯৯৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজেরই আরেক কিংবদন্তি ব্রায়ান লারা ৩৭৫ রান করে সেই রেকর্ড ভাঙেন।

স্যার গারফিল্ড সোবার্স ছিলেন এমন একজন ক্রিকেটার, যিনি খেলার প্রতিটি বিভাগে সমান দক্ষ ছিলেন। তিনি ছিলেন দুর্দান্ত বামহাতি ব্যাটসম্যান, একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী বামহাতি অর্থোডক্স স্পিন, চিনাম্যান, লেগ স্পিন এবং ফাস্ট-মিডিয়াম—বিভিন্ন ধরনের বোলিং করতে পারতেন। মাঠে তাঁর ফিল্ডিংও ছিল অসাধারণ।

এই বহুমাত্রিক দক্ষতাই তাঁকে ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে পরিপূর্ণ অলরাউন্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আজও অনেক সাবেক ও বর্তমান ক্রিকেট বিশ্লেষকের কাছে তিনি অলরাউন্ডারদের মানদণ্ড।

১৯৭২ সালে মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে বিশ্ব একাদশের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২৫৪ রানের একটি ইনিংস খেলেছিলেন সোবার্স। ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন স্যার ডন ব্র্যাডম্যান সেই ইনিংসকে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দেখা সেরা ইনিংসগুলোর একটি বলে মন্তব্য করেছিলেন।

১৯৬৮ সালে ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে খেলতে গিয়ে গ্ল্যামরগনের বোলার ম্যালকম ন্যাশের এক ওভারে টানা ছয়টি ছক্কা মারেন সোবার্স। প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে এটিই ছিল ছয় বলে ছয় ছক্কার প্রথম স্বীকৃত ঘটনা। এই কীর্তি ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে আজও আলোচিত।

প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর পরিসংখ্যানও বিস্ময়কর। ৩৮৩ ম্যাচে তিনি করেন ২৮ হাজার ৩১৪ রান এবং নেন ১ হাজার ৪৩ উইকেট।

ক্রিকেটে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৫ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবার তাঁকে নাইটহুডে ভূষিত করে। ১৯৯৮ সালে বার্বাডোজ সরকার তাঁকে দেশের জাতীয় নায়কদের একজন হিসেবে ঘোষণা করে।

২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল তাঁকে ক্রিকেট হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত করে। বিশ্ব ক্রিকেটে বছরের সেরা খেলোয়াড়কে দেওয়া আইসিসির সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মাননার নামও রাখা হয়েছে তাঁর নামে—’স্যার গারফিল্ড সোবার্স অ্যাওয়ার্ড’।

সোবার্সের মৃত্যুতে ক্রিকেট বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া এক শোকবার্তায় জানিয়েছে, স্যার গারফিল্ড সোবার্স শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজ নয়, বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের সঙ্গেও তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল।

ভারতের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিসিসিআইও গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছে, সোবার্স ছিলেন ক্রিকেটের একজন সত্যিকারের আইকন। তাঁর অর্জন, ক্যারিবীয় ক্রিকেটে অবদান এবং বিশ্ব ক্রিকেটে রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাবে।

ক্রিকেটে এমন অনেক খেলোয়াড় এসেছেন, যারা ব্যাট হাতে ম্যাচ জিতিয়েছেন। আবার অনেকে বল হাতে ইতিহাস লিখেছেন। কিন্তু ব্যাট, বল এবং ফিল্ডিং—তিন ক্ষেত্রেই সমান আধিপত্য দেখিয়ে যাঁরা খেলাটিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তাঁদের তালিকায় স্যার গারফিল্ড সোবার্সের নাম সবার ওপরে।

তাঁর বিদায়ে ক্রিকেট হারাল শুধু একজন কিংবদন্তিকে নয়, এমন এক ব্যক্তিত্বকে, যিনি খেলাটির সৌন্দর্য, বহুমাত্রিকতা এবং উৎকর্ষের প্রতীক হয়ে ছিলেন। পরিসংখ্যান হয়তো তাঁর কৃতিত্বের একটি অংশ তুলে ধরে, কিন্তু তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার লুকিয়ে আছে সেই অনুপ্রেরণায়, যা তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মের ক্রিকেটার ও ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *