একসময় তিনি ছিলেন একজন উদ্ভাবক, শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবাদী। আজ তিনি ভারতের অন্যতম আলোচিত জনমুখী ব্যক্তিত্ব। লাদাখের সোনম ওয়াংচুক, যিনি একসময় বরফ সংরক্ষণের অভিনব প্রযুক্তি ‘আইস স্তুপা’ উদ্ভাবনের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিলেন, এখন কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচক এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে নির্ভরতার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
২০০৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বলিউডের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র থ্রি ইডিয়টস-এ আমির খানের অভিনীত ‘ফুনসুখ ওয়াংডু’ চরিত্রটি তাঁর জীবন ও কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। এরপর ২০১৮ সালে র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তিনি স্বীকৃতি পান। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁর পরিচয় নতুন মাত্রা পেয়েছে—একজন পরিবেশ ও স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের মুখ হিসেবে।
ওয়াংচুক ২০১৩ সালে ‘নিউ লাদাখ মুভমেন্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল টেকসই শিক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়ন।
পরবর্তীতে তাঁর আন্দোলনের মূল দাবি হয়ে ওঠে লাদাখের ভঙ্গুর পরিবেশ রক্ষা এবং ভারতের সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় অঞ্চলটিকে অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমি, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অধিকতর সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।
২০২৩ সালের ২৬শে জানুয়ারি তিনি খারদুংলা পাসে অনশন কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নিলে প্রশাসন তাঁকে গৃহবন্দী করে। এরপর ২০২৪ সালের মার্চে তিনি ২১ দিনের ‘ক্লাইমেট ফাস্ট’ শুরু করেন। ওই কর্মসূচিতে তিনি লাদাখের পরিবেশ রক্ষা, অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন ও খনিজ সম্পদ আহরণের বিরোধিতা এবং স্থানীয় জনগণের অধিকারের বিষয়টি সামনে আনেন।
২০২৫ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর লেহতে একটি বিক্ষোভ চলাকালে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভের সময় বিজেপির একটি কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ এবং লাদাখ হিল কাউন্সিলের প্রাঙ্গণে ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলি চালালে চারজন নিহত এবং আরও অনেকে আহত হন।
ঘটনার পর ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করে, ওয়াংচুক আন্দোলনকে উসকে দিয়েছিলেন। তবে তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সহিংসতা ছিল সরকারের প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের হতাশার বহিঃপ্রকাশ।
দুই দিন পর, ২৬শে সেপ্টেম্বর তাঁকে জাতীয় নিরাপত্তা আইন (এনএসএ)-এর অধীনে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময়ে এলাকায় কারফিউ জারি, ইন্টারনেট সেবা স্থগিত এবং ব্যাপক ধরপাকড় চালানো হয়।
ওয়াংচুকের সমর্থকদের অভিযোগ, তাঁকে আনুষ্ঠানিক আটকের নথি ছাড়াই যোধপুর সেন্ট্রাল জেলে স্থানান্তর করা হয়। একই সময়ে তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান SECMOL-এর বিদেশি অনুদান গ্রহণের লাইসেন্স বাতিল এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে তদন্তও শুরু হয়।
ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে. আঙমো ২০২৫ সালের ২রা অক্টোবর ভারতের সুপ্রিম কোর্টে হেবিয়াস কর্পাস আবেদন করেন। মামলার শুনানি একাধিকবার পিছিয়ে যায়।
অবশেষে ২০২৬ সালের ১৪ই মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁর বিরুদ্ধে জারি করা এনএসএ-র আটকাদেশ প্রত্যাহার করে। প্রায় ১৭০ দিন কারাগারে থাকার পর তিনি মুক্তি পান।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেনারেশন জেড-এর মধ্যে ওয়াংচুকের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে তিনি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন, যা তরুণদের বড় একটি অংশের উদ্বেগের সঙ্গে মিল রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, লাদাখের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও স্থানীয় জনগণের অধিকারের প্রশ্নকে তিনি জাতীয় আলোচনায় তুলে ধরেছেন।
তৃতীয়ত, তাঁর বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের মতো কঠোর আইন প্রয়োগের ঘটনাকে অনেক তরুণ নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি তাঁকে তরুণদের কাছে সহজে পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর ভিডিও, বক্তব্য ও প্রচারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে।
ভারত সরকার ওয়াংচুকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নতাবাদ, বিদেশি প্রভাব এবং বিদেশি অর্থায়ন-সংক্রান্ত অভিযোগ তুলেছে। তাঁর সমর্থকদের একটি অংশ এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে।
অন্যদিকে সরকারের অবস্থান হলো, জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সোনম ওয়াংচুক এখন শুধু একজন উদ্ভাবক বা পরিবেশবাদী নন; তিনি ভারতের সমসাময়িক রাজনীতির একটি আলোচিত মুখ। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি পরিবেশ, গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্থানীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষার প্রতীক। সমালোচকদের কাছে তিনি বিতর্কিত রাজনৈতিক কর্মী।
মুক্তির পর তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন। ভবিষ্যতে তিনি কেবল লাদাখের অধিকার আদায়ের আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ থাকবেন, নাকি জাতীয় রাজনীতিতে আরও বড় ভূমিকা নেবেন—সেটিই এখন দেখার বিষয়।