সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, মিয়ানমার সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ ১০৯ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের প্রস্তাব সরকার বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিজিবির জনবল ও অবকাঠামো উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সোমবার (২০শে জুলাই) রাজধানীর পিলখানায় বিজিবি সদর দপ্তর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
এর আগে সকালে বিজিবি সদর দপ্তরে পৌঁছালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটি সুসজ্জিত চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। পরে তিনি বাহিনীর অপারেশনাল, প্রশাসনিক, প্রশিক্ষণ ও চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত ব্রিফিং গ্রহণ করেন।
পিলখানার শহীদ শাকিল আহমেদ হলে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিবি সদস্যদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। সভায় বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জেসিও, বিভিন্ন পদবির সদস্য এবং অসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত বিজিবি সদস্যরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, অবৈধ অনুপ্রবেশ, পুশ-ইন, মাদক, অস্ত্র ও অন্যান্য চোরাচালান এবং মানবপাচার প্রতিরোধে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। বাহিনীর শৃঙ্খলা, চেইন অব কমান্ড, পেশাদারিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি সদস্যদের গুজব ও অপপ্রচার থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। সীমান্তবর্তী জনগণের আস্থা অর্জন, দুর্যোগে মানবিক ভূমিকা পালন এবং সর্বক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন অনুসরণের কথাও উল্লেখ করেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম তিনি বিজিবি সদর দপ্তর পরিদর্শন করলেন। এ সময় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও বাহিনীর সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
মাদক নিয়ন্ত্রণে বিজিবির ভূমিকার প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রশিক্ষণ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বিজিবির বিদ্যমান ডগ স্কোয়াডের সহায়তা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, বিজিবির সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক যানবাহন, অস্ত্র, সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক অবকাঠামো উন্নয়ন, হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের বিষয়েও সরকার কাজ করবে।
সাম্প্রতিক বন্যায় বিজিবির ভূমিকার প্রশংসা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান, ত্রাণ বিতরণ এবং জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাহিনী প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে। ভবিষ্যতে দুর্যোগ মোকাবিলায় এ ধরনের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা হবে।
মিয়ানমার সীমান্তের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, সীমান্তের ওপারে চলমান সংঘাত, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং মাদক চোরাচালানের ঝুঁকি বিবেচনায় ১০৯ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। এছাড়া ল্যান্ডমাইন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিজিবিকে মাইন ডিটেকশন যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে।
পুশ-ইন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর কোনো ব্যক্তিকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশ-ইন করতে দেওয়া হয়নি। বিজিবি এবং সীমান্তবর্তী জনগণের সহযোগিতায় এ ধরনের সব অপচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক হলে প্রচলিত দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় জাতীয়তা যাচাইয়ের পর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর বাইরে কাউকে অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
পুশ-ইন প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখা বিজিবি সদস্যদের স্বীকৃতির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিবছর বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিজিবিতে পদক দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে পুশ-ইন প্রতিরোধে অসাধারণ ভূমিকা রাখা সদস্যদের জন্য অতিরিক্ত সম্মাননা বা প্রণোদনার বিষয়টি বিজিবির মহাপরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করে বিবেচনা করা হবে।
সফরের অংশ হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিবি সদর দপ্তরের পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন। পরে তিনি সীমান্ত গৌরব, ২০০৯ শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ ও দীপ্ত সীমান্ত বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। সীমান্ত কুঞ্জ এলাকায় একটি বৃক্ষরোপণও করেন তিনি।