ভ্যাটিকানে নোবেলজয়ীদের সতর্কবার্তা: এআই ও পারমাণবিক অস্ত্রের সমন্বয় মানবতার জন্য নজিরবিহীন হুমকি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং পারমাণবিক অস্ত্রের সমন্বয় মানবসভ্যতার জন্য নতুন ও অভূতপূর্ব ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির এই সময়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, নৈতিক নেতৃত্ব এবং কার্যকর বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। এমনই সতর্কবার্তা এসেছে ভ্যাটিকানে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল নোবেল লরিয়েটস অ্যাসেম্বলি থেকে।

তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলন ১৬ই  জুলাই রোমের ক্যাপিটোলাইন হিলে “হিউম্যানিটি এট দ্য থ্রেশহোল্ড ” শীর্ষক যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। সম্মেলনে অংশ নেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নোবেলজয়ী, বিজ্ঞানী, নীতিনির্ধারক এবং ধর্মীয় নেতারা।

সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, বিশ্ব এখন এমন এক এআই অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকে এগোচ্ছে, যা বিদ্যমান পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমাণবিক যুগের সূচনার সঙ্গে বর্তমান এআই বিপ্লবের তুলনা টেনে এতে বলা হয়েছে, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে মানবজাতি আবারও ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।

নোবেলজয়ীরা মনে করেন, এআই পারমাণবিক কমান্ড ব্যবস্থায় মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা দুর্বল করে দিতে পারে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সাইবার হামলার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তথ্যযুদ্ধ ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণাও আন্তর্জাতিক আস্থা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ভ্যাটিকানের কাস্তেল গানদোলফোতে অবস্থিত বর্গো লাউদাতো সি-তে আয়োজিত উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য দেন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। পরে তিনি “আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স,ডেমক্রেসি এন্ড দ্য ইকোনমিক রেভুল্যুশন : টুওয়ার্ড এ নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার” শীর্ষক অধিবেশনেও বক্তব্য রাখেন। সেখানে তিনি প্রযুক্তির অগ্রগতিকে মানবকল্যাণ, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সম্মেলনের ফাঁকে প্রফেসর ইউনূস সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার আর্চপ্রিস্ট ও ফ্যাব্রিক অব সেন্ট পিটারের সভাপতি কার্ডিনাল মাউরো গামবেত্তি এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মহাপরিচালক ড. কু দংইউর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।

সম্মেলনে আরও অংশ নেন ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী রোমানো প্রোদি, শান্তিতে নোবেলজয়ী জোডি উইলিয়ামস, সাংবাদিক মারিয়া রেসা, চিকিৎসক ডেনিস মুকওয়েগে, কলম্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোসসহ বিভিন্ন নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব। উপস্থিত ছিলেন বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস-এর বিজ্ঞান ও নিরাপত্তা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড্যানিয়েল হোলজ, পন্টিফিক্যাল অ্যাকাডেমিজ অব সায়েন্সেসের চ্যান্সেলর কার্ডিনাল পিটার টার্কসন, পন্টিফিক্যাল অ্যাকাডেমি ফর লাইফের সভাপতি আর্চবিশপ রেনজো পেগোরারো এবং হলিউড অভিনেত্রী শ্যারন স্টোন।

ঘোষণাপত্রে ছয়টি অগ্রাধিকার

১. নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা রোধ:
এআই ও পারমাণবিক অস্ত্রকে কেন্দ্র করে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সংযম, সহযোগিতা এবং শক্তিশালী বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

২. দায়িত্বশীল প্রযুক্তি উন্নয়ন:
এআই প্রযুক্তি উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মানব তত্ত্বাবধানবিহীন, নিজে নিজে সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে—এমন রিকারসিভ সেলফ-ইম্প্রুভিং এআই ব্যবস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব করা হয়েছে।

৩. দায়িত্বশীল ব্যবহার:
পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এআইয়ের কোনো ভূমিকা না রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পারমাণবিক অবকাঠামোকে সাইবার হামলা থেকে সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

৪. বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা:
এআই বিষয়ে জাতিসংঘের অধীনে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্যানেল এবং একটি বৈশ্বিক তদারকি প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছে।

৫. নেতৃত্ব ও শিক্ষা:
এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব, নৈতিক শিক্ষা এবং প্রযুক্তি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৬. পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ:
যাচাইযোগ্য পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) এবং পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তিসহ বিদ্যমান আন্তর্জাতিক কাঠামোকে আরও কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ঘোষণাপত্রে পোপ লিও চতুর্দশের “নিরস্ত্র এবং নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে শান্তি” প্রতিষ্ঠার আহ্বান স্মরণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ভয়, প্রতিরোধ কিংবা পারস্পরিক ধ্বংসের হুমকির ওপর টেকসই নিরাপত্তা গড়ে উঠতে পারে না। স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন আস্থা, সংলাপ এবং মানবিক দায়িত্ববোধ।

ঘোষণাপত্রের শেষাংশে দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ও বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের ঐতিহাসিক আহ্বান—”মানবতাকে স্মরণ করো, বাকিটা ভুলে যাও”—উদ্ধৃত করা হয়েছে। নোবেলজয়ীদের ভাষায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানবজাতি এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটা নিরাপদ পৃথিবী পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *