ট্রাম্পের হিটলিস্টে ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’: ইরানের গোপন পারমাণবিক দুর্গ ঘিরে নতুন উত্তেজনা

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক উত্তেজনা আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। সেই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একটি রহস্যময় পাহাড়ি স্থাপনা—‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’। ইরানে এর নাম ‘কুহ-এ কোলাং গাজ লা’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই এই স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছেন। এর পর থেকেই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নজর পড়েছে পাহাড়ের গভীরে নির্মিত এই ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্সের দিকে।

হিউ হিউইট শো-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনে সেখানে হামলা চালানো হবে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের পথও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।

পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন মধ্য ইরানের জাগ্রোস পর্বতমালায় অবস্থিত। এটি নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনার প্রায় ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্যাটেলাইট চিত্রে এখানে ব্যাপক খননকাজ, নতুন সুড়ঙ্গ এবং অবকাঠামো নির্মাণের প্রমাণ মিলেছে।

পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, স্থাপনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এর গভীরতা। বিভিন্ন মূল্যায়নে বলা হয়েছে, মূল সুড়ঙ্গগুলো পাহাড়ের নিচে প্রায় ৭৯ থেকে ১০০ মিটার গভীরে নির্মিত। শক্ত গ্রানাইট শিলার নিচে অবস্থান করায় এটি প্রচলিত ‘বাঙ্কার-বাস্টার’ বোমার আঘাতও সহ্য করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, এই স্থাপনায় উন্নত সেন্ট্রিফিউজ তৈরির কাজ হচ্ছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশ এবং পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, এখানে হয়তো ঘোষণাবিহীন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির (ISIS) বিশ্লেষকদের মতে, পাহাড় থেকে অপসারণ করা মাটির পরিমাণ এবং সুড়ঙ্গের বিস্তার ইঙ্গিত দেয় যে ভেতরে বড় ধরনের স্থাপনা নির্মিত হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এর প্রকৃত ব্যবহার স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

২০২৫ সালে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ফোর্দো, নাতানজ ও ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন আরও বেশি আলোচনায় আসে।

পরবর্তী স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে। কিছু সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। ভারী যানবাহনের চলাচলের চিহ্নও দেখা গেছে। একটি পুরোনো সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্সে নতুন কংক্রিটের আবরণ যুক্ত করার প্রমাণও বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন।

এসব তথ্যের ভিত্তিতে পশ্চিমা নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইরান হয়তো আরও সুরক্ষিত স্থানে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক অবকাঠামো স্থানান্তর করছে। যদিও এই দাবির স্বাধীন নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই।

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা কখনও পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন পরিদর্শনের সুযোগ পায়নি। কারণ ইরান এটিকে ঘোষিত সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র হিসেবে নিবন্ধন করেনি।

আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি অতীতে এই স্থাপনা সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাইলেও ইরান বিস্তারিত তথ্য দেয়নি। ২০২৫ সালের সংঘাতের পর ইরান আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার আরও সীমিত করে।

অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেছেন, দেশে কোনো গোপন সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের সব ঘোষিত পারমাণবিক স্থাপনাই আইএইএর নজরদারির আওতায় রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি যদি ভবিষ্যতে পুনর্গঠিত হয়, তাহলে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন তার অন্যতম সম্ভাব্য কেন্দ্র হতে পারে।

এর প্রধান কারণগুলো হলো—

  • পাহাড়ের গভীরে শক্তিশালী ভূগর্ভস্থ অবস্থান।
  • নাতানজের মতো গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থান।
  • আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের বাইরে থাকা।
  • আধুনিক ও সম্প্রসারণযোগ্য সুড়ঙ্গ অবকাঠামো।

এসব কারণেই স্থাপনাটি পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরে রয়েছে।

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এ ইরানের একাধিক পারমাণবিক স্থাপনায় ভারী বোমা নিক্ষেপ করা হয়। সে সময় ট্রাম্প অভিযানকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন।

তবে বিভিন্ন মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়, হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। বরং তা সাময়িকভাবে পিছিয়ে যায়। এরপর থেকেই আরও গভীর ও সুরক্ষিত স্থাপনার গুরুত্ব বেড়ে যায়।

ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে হামলার কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি।

অন্যদিকে ইরানও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করে আসছে। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও নিষেধাজ্ঞার কঠোর সমালোচনা করছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন শুধু একটি পাহাড়ি স্থাপনার নাম নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, পারমাণবিক কূটনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছে। তবে এর প্রকৃত কার্যক্রম সম্পর্কে এখনো বহু প্রশ্নের উত্তর অজানা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *