দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে এক মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগে অন্তত ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। বন্যার পানিতে আটকা পড়েছেন ১০ লাখেরও বেশি মানুষ। হাজার হাজার পরিবার ঘরছাড়া হয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক যোগাযোগ, কৃষিজমি, বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় কয়েক দিনের টানা মৌসুমি বৃষ্টিতে নদ-নদীর পানি দ্রুত বেড়ে যায়। পাহাড়ি এলাকায় অতিবৃষ্টির কারণে একাধিক স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটে। এতে প্রাণহানি বাড়ার পাশাপাশি অনেক এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলার মধ্যে রয়েছে বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও ফেনী। এসব জেলার বহু গ্রাম ও জনপদ প্লাবিত হয়েছে। অনেক এলাকায় সড়ক ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
দুর্যোগে ১০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেক পরিবার বাড়ির ছাদ, উঁচু সড়ক কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। নিম্নাঞ্চলের অসংখ্য ঘরবাড়ি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
বন্যার কারণে কৃষি খাতেও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আমন ধানের জমি, সবজি ক্ষেত এবং মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
সরকার, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে দুর্গম এলাকা এবং বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অনেক স্থানে ত্রাণ পৌঁছাতে সময় লাগছে।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রধান চাহিদা এখন নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ খাবার পানি, শুকনো খাবার, ওষুধ এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে ডায়রিয়া, পানিবাহিত সংক্রমণ, চর্মরোগ এবং সাপের কামড়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই দুর্গত এলাকায় দ্রুত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্যানিটেশন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দেশটিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড়ধসের ঘটনা বেড়েছে।
বাংলাদেশ অতীতেও একাধিক ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৯৮ সালের বন্যায় দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। ২০০৭ সালের বন্যায়ও লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। বন্যা-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, নদী ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, পাহাড়ি এলাকায় পরিকল্পিত বসতি এবং কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অর্থায়নও গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এই বন্যা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই হতে পারে মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।