বাসাবোর বৃক্ষমেলায় শিশুদের সবুজের পাঠ

মারুফ আহমেদ

শিশুদের হাতে গাছের চারা, চোখে বিস্ময় আর মুখভরা হাসি। কেউ প্রথমবারের মতো স্পর্শ করছে ফলের গাছ, কেউ ফুলের চারা নিয়ে জানতে চাইছে তার পরিচয়। ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও এমন দৃশ্য এখন প্রতিদিন দেখা যাচ্ছে রাজধানীর বাসাবোর ছোট্ট আইসিসি মাঠে।

‘বৃক্ষমেলা-২০২৬’ নামে আয়োজিত এই মেলায় প্রতিদিনই ভিড় করছেন বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। দীপশিখা স্কুল, এস আর এ মডেল প্রাইমারি স্কুলসহ আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে মেলাটি যেন পরিণত হয়েছে প্রকৃতিকে জানার এক উন্মুক্ত পাঠশালায়।

মেলায় শিশুদের শুধু গাছ দেখানোই হচ্ছে না, তাদের বিভিন্ন গাছের পরিচয়ও তুলে ধরছেন আয়োজকেরা। শিশুরা গাছ স্পর্শ করছে, প্রশ্ন করছে, চারাগাছ হাতে নিয়ে আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির সঙ্গে এমন পরিচয় শিশুদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা ও জীববৈচিত্র্যের প্রতি দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন আয়োজনকে স্থানীয়রা ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। স্বাধীনতার পর এই প্রথম ঢাকা-৯ আসনের বাসাবো এলাকায় গাছকে কেন্দ্র করে এমন একটি জনসম্পৃক্ত বৃক্ষমেলার আয়োজন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।

মেলার উদ্যোক্তা ও সামাজিক সংগঠক এহসান আহাদ খান বলেন, নগরজীবনে সবুজের পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। শিশুদের গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং প্রতিটি পরিবারকে অন্তত একটি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত করাই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।

তার ভাষায়, একটি গাছ রোপণ করি, যত্ন করে বড় করি—এই বার্তা নিয়েই আমরা কাজ করছি। আমরা চাই বাসাবো একটি সবুজ, ছায়াঘেরা এলাকায় পরিণত হোক। যদি প্রতি বছর এমন বৃক্ষমেলার আয়োজন করা যায়, তাহলে নতুন প্রজন্ম প্রকৃতির আরও কাছাকাছি আসবে।”

তিনি আরও বলেন, নগর এলাকায় বায়ুদূষণ ও অক্সিজেনের সংকট মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই। তাই এই মেলার মাধ্যমে মানুষকে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় উৎসাহিত করাই তাদের লক্ষ্য।

মাত্র ৪০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দামের প্রায় একশ ধরনের ফল, ফুল, ঔষধি ও বনজ গাছের চারা পাওয়া যাচ্ছে মেলায়। পাশাপাশি বিক্রি হচ্ছে টব, জৈব সার এবং ছাদবাগানের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

তবে এই আয়োজন কেবল কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে পরিবেশবিষয়ক সচেতনতামূলক বিভিন্ন তথ্য। ডেঙ্গু প্রতিরোধ, ছাদবাগান, পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে তোলা, পশুপাখি পালন এবং বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতামূলক বার্তাও তুলে ধরা হচ্ছে।

বর্ষার বৃষ্টিতেও মেলার প্রাণচাঞ্চল্যে ভাটা পড়েনি। অনেক শিশু-কিশোর ও অভিভাবককে বৃষ্টিতে ভিজেই গাছের চারা নিয়ে বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের মতে, এই উৎসাহই প্রমাণ করে নগরবাসীর মধ্যে সবুজের প্রতি আগ্রহ এখনও অটুট রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মেলাটি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা চলছে। অনেকেই এটিকে রাজধানীর আবাসিক এলাকাভিত্তিক পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের একটি ভালো উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে নগর এলাকায় ছোট ছোট সবুজ উদ্যোগও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। একটি মেলা হয়তো একদিনে শহর বদলে দিতে পারবে না, কিন্তু শিশুদের হাতে একটি করে গাছ তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়েই ভবিষ্যতের পরিবেশবান্ধব নাগরিক তৈরি হওয়ার ভিত্তি গড়ে উঠতে পারে।

৫ জুলাই শুরু হওয়া ‘বৃক্ষমেলা-২০২৬’ চলবে ১৫ জুলাই পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বাসাবোর আইসিসি মাঠে সবার জন্য উন্মুক্ত এই আয়োজন।

নগরের কংক্রিটের ভিড়ে এই ছোট্ট সবুজ উদ্যোগ যেন একটি বড় বার্তা দিচ্ছে—পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, বরং প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি শিশু এবং প্রতিটি মহল্লারও। একটি চারাগাছ থেকেই শুরু হতে পারে আরও সবুজ, আরও বাসযোগ্য একটি শহরের গল্প।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *