নগর স্বাস্থ্যসেবায় নতুন সূচনার আশা, তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন বাস্তবায়ন

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এখনও দেশের অন্যতম বড় অসম্পূর্ণ ক্ষেত্র। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নগরায়ণের বাস্তবতায় এই খাতকে শক্তিশালী করা না গেলে স্বাস্থ্যসেবায় বিদ্যমান বৈষম্য আরও বাড়বে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই বছর আগে জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ যে ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিতামূলক ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা করেছিলেন, তার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে নতুন করে অগ্রাধিকার দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।

সামগ্রিক পরিসংখ্যানে নগরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি গ্রামাঞ্চলের তুলনায় ভালো মনে হলেও বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। বিশেষ করে নগরের বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাসকারী মানুষের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি দেশের গড় মানের চেয়েও পিছিয়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরের দরিদ্র জনগোষ্ঠী একদিকে হাম, ডেঙ্গু ও কোভিড-১৯-এর মতো সংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে, অন্যদিকে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগও দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে বায়ুদূষণ, অতিরিক্ত জনঘনত্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ের বড় অংশ এখনও সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হয়। মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই আসে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক খরচ থেকে। এর মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ ব্যয় হয় শুধু ওষুধ কেনার জন্য।

স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, এ কারণে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শুধু জনস্বাস্থ্যের বিষয় নয়; এটি দারিদ্র্য হ্রাস, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

সাম্প্রতিক সময়ে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এ খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে আবারও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব এখন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পনির্ভর কার্যক্রমের পরিবর্তে একটি সমন্বিত জাতীয় কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিগত সিদ্ধান্তের চেয়ে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো কার্যকর বাস্তবায়ন। সেবা যেন শুধু বড় শহরের কয়েকটি কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটি নগর ওয়ার্ড এবং প্রতিটি অনানুষ্ঠানিক বসতিতে পৌঁছে—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তাদের মতে, শুধু নতুন ভবন নির্মাণ বা অবকাঠামো বাড়ালেই হবে না; নিশ্চিত করতে হবে মানসম্মত, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, “আলো ক্লিনিক” উদ্যোগ দেখিয়েছে যে তুলনামূলক কম ব্যয়েও কার্যকর নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব। এখন সরকারের সামনে সুযোগ রয়েছে এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশব্যাপী আধুনিক, মানসম্মত এবং সর্বজনীন নগর স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের।

প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি নগর-প্রধান দেশে পরিণত হবে। সে সময় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে তার ওপর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ লক্ষ্য অর্জনে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নগর ও মহানগর পর্যায়ে শক্তিশালী নেতৃত্ব, কার্যকর তদারকি, একটি সমন্বিত নগর স্বাস্থ্যনীতি, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং টেকসই অর্থায়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

তাদের ভাষায়, নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ কেবল স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, সামাজিক সমতা এবং ভবিষ্যৎ নগর বাংলাদেশের ভিত্তি শক্তিশালী করার অন্যতম পূর্বশর্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *