ভিএআর বিতর্কে তোলপাড় বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচ ঘিরে ফুটবল বিশ্ব দুই ভাগ

বাংলাদেশ সময় ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব সিক্সটিনে আর্জেন্টিনা ও মিশরের ম্যাচটি শুধু নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের জন্য নয়, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)-এর একাধিক সিদ্ধান্তের কারণেও বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। বিশেষ করে মিশরের একটি গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত ফুটবল বিশ্লেষক, সাবেক রেফারি ও সমর্থকদের মধ্যে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ম্যাচের ৬২তম মিনিটে মিশরের মিডফিল্ডার মোস্তাফা জিকো দুর্দান্ত এক কাউন্টার অ্যাটাক থেকে বল জালে পাঠান। ওই গোল হলে মিশর ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যেত। তবে গোলের আগে বিল্ড-আপ পর্যায়ে একটি ফাউলের অভিযোগে ভিএআর হস্তক্ষেপ করে। মাঠের রেফারি রিপ্লে দেখে গোলটি বাতিল করেন।

ভিএআর পর্যালোচনায় দেখা যায়, বল দখলের আগে মিশরের মারওয়ান আত্তিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের জার্সি টানেন এবং পায়ে আঘাত করেন। এই ঘটনাকেই আক্রমণাত্মক পর্যায়ের ফাউল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিতর্কের মূল কারণ ছিল ফাউলটি গোল থেকে অনেক দূরে সংঘটিত হওয়া। ঘটনাটি প্রায় পুরো মাঠের দৈর্ঘ্যের সমান দূরত্বে ঘটে। এরপর প্রায় ১০ সেকেন্ড ধরে আক্রমণ চলার পর গোল হয়। সমালোচকদের প্রশ্ন, এত দূরের এবং সময়ের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে ভিএআর-এর মাধ্যমে ফিরিয়ে এনে গোল বাতিল করা কতটা যৌক্তিক।

ফক্স স্পোর্টস-এর বিশ্লেষক রব গ্রিন মনে করেন, এমন পরিস্থিতিতে ভিএআর-এর হস্তক্ষেপ তার মূল উদ্দেশ্যের বাইরে চলে গেছে। তার মতে, মাঠের রেফারি ঘটনাটি দেখেছিলেন এবং খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। পরে ভিএআর-এর মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বিতর্ক তৈরি করেছে।

সাবেক ফিফা রেফারি মার্ক ক্ল্যাটেনবার্গও একই ধরনের মত দেন। তার ভাষ্য, ঘটনাটি ফাউল ছিল না। তাই ভিএআর-এর হস্তক্ষেপ হওয়া উচিত ছিল না। তিনি বলেন, পুরো টুর্নামেন্টে রেফারিরা শারীরিক চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নিয়েছেন।

অন্যদিকে, ভিএআর সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নেন রেফারিং বিশেষজ্ঞরা। ফক্স স্পোর্টস-এর ড. জো ম্যাকনিক বলেন, আক্রমণাত্মক পর্যায়ে সংঘটিত কোনো ফাউল যদি একই আক্রমণের ধারাবাহিকতায় গোলে রূপ নেয়, তাহলে ভিএআর প্রোটোকল অনুযায়ী সেই গোল বাতিল করা যায়।

সাবেক প্রিমিয়ার লিগ রেফারি ও ভিএআর বিশ্লেষক অ্যান্ডি ডেভিসের মতে, ভিডিও রিপ্লেতে জার্সি টানা এবং পায়ে আঘাত—দুটিই স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। তাই রেফারির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা নিয়মের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ম্যাচ শেষে মিশরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান রেফারীর সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তার দল ন্যায্য বিচার পায়নি। তবে সরাসরি রেফারিকে দোষারোপ না করে তিনি এটিকে হতাশাজনক পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করেন।

গোল বাতিল হলেও মিশর পরে আবার গোল করে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। কিন্তু শেষ ভাগে আর্জেন্টিনা দারুণভাবে ম্যাচে ফিরে আসে। ৭৯ মিনিটে ব্যবধান কমায় তারা। ৮৩ মিনিটে লিওনেল মেসি সমতা ফেরান। পরে অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনা জয় নিশ্চিত করে।

ম্যাচে আরও দুটি ভিএআর-সংশ্লিষ্ট ঘটনা আলোচনা তৈরি করে। আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে ফাউলের অভিযোগ ওঠে। তবে ভিএআর সেটিকে পর্যালোচনার মতো ঘটনা মনে করেনি। শেষ মুহূর্তে মোহাম্মদ সালাহ পেনাল্টির আবেদন জানালেও রেফারি ও ভিএআর উভয়েই খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এই ম্যাচ আবারও প্রশ্ন তুলেছে, ভিএআর-এর পর্যালোচনার সীমা কোথায় হওয়া উচিত। প্রযুক্তির উদ্দেশ্য স্পষ্ট ভুল সংশোধন করা নাকি আক্রমণের অনেক আগের ঘটনাও খতিয়ে দেখা—এ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, নিয়মের কঠোর প্রয়োগ হয়েছে। অন্য অংশের মতে, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার ম্যাচের স্বাভাবিক প্রবাহ ও রেফারির কর্তৃত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ফলে আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচটি শুধু বিশ্বকাপের একটি নকআউট লড়াই হিসেবেই নয়, ফুটবলে ভিএআর-এর ব্যবহার, সীমা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *