ঢাকার ধানমন্ডির গ্যালারি চিত্রকে চলছে চিত্রশিল্পী সামছুল আলম আজাদের একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘দৃশ্যমান কাঠামো’। প্রদর্শনীতে শিল্পী তাঁর দীর্ঘদিনের শিল্পচর্চার অভিজ্ঞতাকে বিমূর্ত শিল্পভাষায় উপস্থাপন করেছেন। রঙ, রেখা, গঠন এবং প্রকৃতি থেকে শুরু করে মহাজাগতিক বিন্যাস—বিভিন্ন বিষয় তাঁর ক্যানভাসে নতুন ব্যাখ্যা পেয়েছে।
প্রদর্শনীর অধিকাংশ কাজই বিমূর্তধর্মী। এখানে প্রচলিত অর্থে প্রতিকৃতি বা মানবমুখের উপস্থিতি নেই। বরং আকৃতি, রঙের স্তরবিন্যাস, আলোর ব্যবহার এবং দৃশ্যমান কাঠামোর মধ্য দিয়ে শিল্পী দর্শককে নিজের মতো করে অর্থ খুঁজে নেওয়ার সুযোগ করে দেন। প্রতিটি চিত্র যেন একটি নির্দিষ্ট গল্প না বলে, বরং একাধিক সম্ভাব্য অনুভূতির দ্বার খুলে দেয়।
শিল্পী সামছুল আলম আজাদ জানান, তাঁর শিল্পচর্চার অন্যতম অনুপ্রেরণা বস্তুর গঠন, প্রকৃতির বিন্যাস এবং মহাজাগতিক কাঠামো। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে টেলিস্কোপের মাধ্যমে যে বিশাল কসমিক নেটওয়ার্ক বা গ্যালাক্সির জালসদৃশ বিন্যাস দেখা যায়, সেই ধারণাও তাঁর কাজের ভাবনায় প্রভাব ফেলেছে। বিমূর্ত চিত্রভাষার মাধ্যমে তিনি দৃশ্যমান জগতের বাইরে থাকা এক ধরনের মহাজাগতিক সম্পর্ক ও বিন্যাসের অনুসন্ধান করেছেন।
প্রদর্শনী ঘুরে দেখা দর্শকদের মতে, ছবিগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য রঙের সাহসী ব্যবহার। বিশেষ করে নীল রঙের উপস্থিতি একাধিক ক্যানভাসে চোখে পড়ে। শিল্পীর ভাষ্য, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা মানুষের কল্পনায় যে রঙ সবচেয়ে বেশি ভেসে ওঠে, তা তাঁর কাছে নীল। সেই অনুভূতির প্রতিফলনই বিভিন্ন কাজে ফিরে এসেছে নানা মাত্রায়।
একসময় জলরঙের কাজের জন্য পরিচিত সামছুল আলম আজাদের সাম্প্রতিক চিত্রভাষা আরও পরিণত ও শক্তিশালী হয়েছে বলেও মনে করছেন শিল্পানুরাগীরা। তাঁর ক্যানভাসে কখনও বাংলাদেশের প্রকৃতির রূপ, কখনও ভূমির গঠন, আবার কখনও ভাঙা উপকরণকে নতুন শিল্পমাধ্যমে রূপ দেওয়ার পরীক্ষামূলক প্রয়াস দেখা যায়। একটি ইট ভেঙে তার গুঁড়োকে শিল্প-উপাদান হিসেবে ব্যবহার করার মতো পরীক্ষাও তাঁর কাজে যুক্ত হয়েছে।
প্রদর্শনীর একটি প্রসঙ্গে শিল্পী জানান, বিদেশের একটি প্রদর্শনীতে তাঁর কাগজে আঁকা একটি পাখির ছবি প্রদর্শিত হয়েছিল। সেই কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, পাখিটির প্রাণ না থাকলেও তার ওপরে বিস্তৃত আকাশ রয়েছে। এই ভাবনার মধ্য দিয়ে তিনি অস্তিত্ব, শূন্যতা এবং সম্ভাবনার সম্পর্ক তুলে ধরতে চেয়েছেন।
শিল্পবোদ্ধাদের মতে, একটি চিত্রকর্ম উপলব্ধির জন্য আনুষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষা অপরিহার্য নয়। দর্শকের ব্যক্তিগত অনুভূতি, পর্যবেক্ষণ এবং কল্পনাশক্তিই শিল্পের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে। ‘দৃশ্যমান কাঠামো’ প্রদর্শনীও সেই সুযোগই তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিটি দর্শক নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে ছবির অর্থ নির্মাণ করতে পারেন।
প্রদর্শনীতে আলো-ছায়ার সূক্ষ্ম ব্যবহার, প্রতীকী ভাষা এবং গঠনগত পরীক্ষানিরীক্ষা দর্শকদের ভাবনার ভেতরে প্রবেশ করতে বাধ্য করে। কোথাও রঙের সংঘর্ষ, কোথাও প্রশান্তির বিস্তার, আবার কোথাও অদৃশ্য কোনো বাস্তবতার ইঙ্গিত—এসব মিলিয়ে প্রদর্শনীটি শুধু চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা নয়, বরং ভাবনারও একটি পরিসর তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পচর্চায় সামছুল আলম আজাদের এই আয়োজন শিল্পের বিমূর্ত ধারাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। ‘দৃশ্যমান কাঠামো’ দর্শকদের সামনে এমন এক শিল্পভাষা হাজির করেছে, যেখানে প্রকৃতি, দর্শন, বিজ্ঞান এবং ব্যক্তিগত অনুভূতি একই ক্যানভাসে মিলিত হয়েছে।