রাজশাহীতে বালুর বাজারে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ, এক মাসে দাম প্রায় দ্বিগুণ

মাসুদ রানা

রাজশাহী অঞ্চলের বালুর বাজারে একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ উঠেছে। নির্মাণ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও আবাসন উদ্যোক্তাদের দাবি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বালুর দাম প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। এতে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক নির্মাণ, বহুতল ভবন এবং আবাসন খাতের কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বর্তমানে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে কার্যত একটি বালুমহাল থেকেই বালু সরবরাহ হচ্ছে। এ অবস্থায় বাজারে প্রতিযোগিতা কমে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিপুল পরিমাণ বালু মজুত রেখে সরবরাহ সীমিত করায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। এর সুযোগে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে দাম।

রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নবনির্বাচিত পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, ছয় মাস আগেও ৭৫০ সিএফটি ধারণ ক্ষমতার ১০ চাকার এক ট্রাক বালুর দাম ছিল প্রায় ৬ হাজার টাকা। বর্তমানে একই পরিমাণ বালুর দাম ১৫ হাজার টাকারও বেশি। সরকারি প্রকল্পের নির্ধারিত দর অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে ঠিকাদারেরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

নির্মাণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বালুর পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে নির্মাণ ব্যয় গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে চলমান সরকারি প্রকল্পগুলো।

রাজশাহী চেম্বারের পরিচালক এবং মানহা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শাহ মাইনুল হোসেন চৌধুরী শান্ত জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানের অধীনে সিটি করপোরেশন ও এলজিইডির প্রায় ১৬ কোটি টাকার দুটি সড়ক প্রকল্প চলছে। কিন্তু বালুর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে কয়েক দিন আগে কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার গাজী কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী সালাউদ্দিন গাজীর অভিযোগ, গত বছর শ্যামপুর বালুমহালের ইজারাও একই প্রতিষ্ঠানের হাতে ছিল। সে সময় বিপুল পরিমাণ বালু মজুত করা হয়। চলতি বছর প্রেমতলী বালুমহালও একই প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় পুরো অঞ্চলের বালুর বাজার কার্যত একটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তাঁর দাবি, এই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের সুযোগে অল্প সময়ে কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত মুনাফা করা হয়েছে।

মাইসা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ইয়াহিয়া খান মিলু বলেন, রাজশাহী মহানগরী ও জেলার শতাধিক সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ঝুঁকির মুখে রয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ঠিকাদারেরা সম্মিলিতভাবে কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

বালুর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে আবাসন খাতেও। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশন অব রাজশাহীর (রেডা) সাধারণ সম্পাদক আ.স.ম. মিজানুর রহমান কাজী বলেন, নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সদস্যরা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত লোকসানের আশঙ্কা করছেন। ইতোমধ্যে অনেক আবাসন প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে চলছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বালু নির্মাণ শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। এর মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে সিমেন্ট, রড, ইট ও শ্রম ব্যয়ের সঙ্গে মিলিয়ে প্রকল্পের মোট ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাট ও ভবন নির্মাণের খরচেও পড়ে।

রোববার রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির একটি প্রতিনিধিদল রাজশাহী মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তারা বাজার পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।

চেম্বারের সিনিয়র সহসভাপতি শামসুর রহমান শান্তন বলেন, পুলিশ কমিশনার বিভাগীয় কমিশনার, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, আরডিএ চেয়ারম্যান এবং জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছেন। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) অভিজিত সরকার বলেন, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-২০২৫-এ ইজারামূল্য নির্ধারণের বিধান রয়েছে। তবে বাজারে বালুর খুচরা বা পাইকারি মূল্য নির্ধারণের কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান নেই।

তিনি বলেন, অতিরিক্ত মূল্য আদায়, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা অন্য কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইজারাদার রাজু আহমেদ মামুনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার রমজান আলী অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, নদীতে পানি বৃদ্ধি, ড্রেজিং ব্যয় এবং পরিচালন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বালুর দাম বেড়েছে। পাশাপাশি চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকাও মূল্যবৃদ্ধির কারণ। তাঁর দাবি, সিন্ডিকেট বা একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ সঠিক নয়।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো অঞ্চলে একটি বা সীমিতসংখ্যক উৎসের ওপর সরবরাহ নির্ভরশীল হয়ে পড়লে মূল্য নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি তৈরি হয়। কার্যকর বাজার তদারকি, প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত নজরদারি না থাকলে এমন পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

এখন ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও আবাসন উদ্যোক্তাদের প্রধান দাবি, বাজারে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, সরবরাহ বৃদ্ধি এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বালুর বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *