সমালোচনার সংকট ও নন্দনতত্ত্বের দ্বৈরথ: শহীদুল জহির কোন শ্রেণির?

মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম

আরে মিয়া, একটা কথা কই। আমরা না প্রায়ই ভাবি, সমালোচকের কাম বুঝি সবাইরে বাহবা দেওয়া। এইডা কিন্তু ভুল ধারণা। আসল সমালোচক কারও মন রাইখা চলে না; বরং জমাট বাঁধা রুচিরে একটু ঝাঁকি দেয়। মানুষরে অস্বস্তিতে ফালায়, এমন প্রশ্ন করে যেইডা শুনতে কষ্ট লাগে। তাই ইতিহাসে দেখবেন, কত বড় বড় সমালোচক কত বড় বড় লেখকেরে একেবারে নাকচ কইরা দিছে। পরে ইতিহাস তাদের রায় মানছে কি মানে নাই, ওইডা আলাদা কথা। কিন্তু তারা যে প্রশ্নগুলা তুলছে, ওই প্রশ্নের ভেতর দিয়াই সাহিত্যের নতুন রাস্তা খুলছে।

অস্কার ওয়াইল্ড একটা অসাধারণ কথা কইছিলেন—

“The highest, as the lowest, form of criticism is a mode of autobiography.”

কথাটার মানে হইল, সমালোচনা করতে গিয়া মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের নন্দনতত্ত্ব, নিজের বিশ্বাস আর নিজের সময়ের কথাই প্রকাশ করে। তাই একজন সমালোচক যখন কোনো লেখকের বিরোধিতা করেন, তখন তিনি শুধু একজন মানুষরে না; একটা সাহিত্যিক “ধারণা”, একটা ভাষা, একটা শিল্পদর্শনের সঙ্গেও তর্কে নামেন।

বোরহেসও একই রকম গভীর কথা কইছেন—

“A book is not an isolated being; it is a relationship.”

বই একলা কিছু না; বই মানেই সম্পর্ক। লেখকের সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ক, আবার লেখকের সঙ্গে সমালোচকেরও সম্পর্ক। অনেক সময় সবচেয়ে কড়া সমালোচনাই একটা লেখকরে, বইরে সবচেয়ে দীর্ঘ জীবন দিয়া যায়। কারণ যে লেখক যে বই নিয়া কোনো তর্ক নাই, সেই বই একদিন বইয়ের তাকেই ঘুমায়। আর যেই বই নিয়া তর্ক থামে না, সেই বই বারবার নতুন পাঠক খুঁজে পায়।

এইখান থেইকাই জয়েস আর ভার্জিনিয়া উলফের গল্পটা শুরু করা যায়। ১৯২২ সালে Ulysses বাইর হইল। আইজকা আমরা বইলা বেড়াই—বিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী উপন্যাসগুলার একটা। কিন্তু তখনকার দিনের গল্প আলাদা। আধুনিকতাবাদেরই আরেক বড় নাম ভার্জিনিয়া উলফ বইটা পড়ে ডায়েরিতে লিখলেন—”an illiterate, underbred book.” পরে আবার কইলেন, বইটা আত্মপ্রদর্শনমূলক, অসংযত, এমনকি অশোভনও।

এখন প্রশ্ন হইতে পারে—তাইলে উলফ কি জয়েসরে বুঝেন নাই? বিষয়টা এত সোজা না।

উলফেরও কিন্তু নিজের একখান সাহিত্যি মেজাজ আছিল, মিয়া। তিনি মনে করতেন, উপন্যাস মানে হেইডা এমন না যে যা মন চায় তাই কইরা দিলাম। উপন্যাসের একটা তাল আছে, একটা লয় আছে, একটা গড়ন আছে, একটা আদব-কায়দা আছে। শিল্পেরও একটা তহজিব লাগে—এইডাই আছিল তাঁর বিশ্বাস।

আর জয়েস? হেই ব্যাটা আইসা এক্কেরে সব খাতা-কলম গুলাইয়া দিল। ভাষারে এমন প্যাঁচ দিল যে ব্যাকরণই হাবুডুবু খাইতে লাগল। মানুষের মনের ভিতরের কথাডারে টান দিয়া গল্পের মাঝখানে বসাইয়া দিল। তিনি খালি নতুন একখান উপন্যাস লেখেন নাই; “উপন্যাস” মানে কী—এই হিসাবডাই নতুন কইরা লিখা শুরু করলেন।

তাই উলফের আপত্তি জয়েস নামের মানুষটার লগে আছিল না। তার আপত্তি আছিল—উপন্যাস কোন দিক দিয়া যাইব, সেই নিয়া। তিনি এক রাস্তার যাত্রী, জয়েস আরেক রাস্তার। দুইজনেই শিল্পের ভাল চাইতেছিলেন, কিন্তু দুইজনের কম্পাস দুই দিকে ঘুরতেছিল।

শেষমেশ ইতিহাস জয়েসরে মাথায় তুইলা রাখছে। কিন্তু তাই বইলা উলফের কথাগুলা ফালাইয়া দেওনের জিনিস না। বরং এই ঝগড়াডাই আমাদের শেখায়, দুইজন খাঁটি শিল্পী একই সময়ে দুইরকম সত্যে ঈমান রাখতেই পারেন। সাহিত্যে একটাই কিবলা—এইরকম কথা কইলে ভুল হইব। আর মিয়া, এই ক্যাঁচাল জয়েস-উলফেই খতম না। দুনিয়ার সাহিত্যে এইরকম তর্ক বারবার আইছে, আবার আইবও।

এইবার ধরেন চিনুয়া আচেবের কথা।

১৯৭৫ সালে An Image of Africa বক্তৃতায় লোকডা এমন একখান কথা কইলেন, দুনিয়ার সাহিত্যপাড়া এক্কেরে থম মাইরা গেল। তিনি কইলেন—”Joseph Conrad was a thoroughgoing racist.” এক লাইনের কথা, কিন্তু ঢিলডা এমন জায়গায় পড়ল, ঢেউ আইজও থামে নাই। কারণ ততদিনে Heart of Darkness ইংরেজি সাহিত্যের একেবারে কাতারের ক্লাসিক।

এখন অনেকে ভাবেন, আচেবে বুঝি কনরাডরে সাহিত্য থেইকা বের কইরা দিতে চাইছিলেন। আরে না, মিয়া। লোকডা ওই কাম করেন নাই। তিনি খালি একটা জবরদস্ত প্রশ্ন ছুইড়া মারছিলেন—একটা বই যত বড়ই হউক, তার ভিতরের নৈতিক অন্ধকার নিয়া প্রশ্ন করা যাইব না ক্যান?

তারও পরে এডওয়ার্ড সাঈদ আইসা কইলেন, কনরাডের আসল সীমাবদ্ধতা তাঁর কলমে না; তাঁর কল্পনায়। Culture and Imperialism বইয়ে তিনি লিখলেন—

“Conrad could neither understand nor imagine a fully developed alternative to imperialism.”

মানে, কনরাড সাম্রাজ্যবাদরে খুব ভালো দেইখা ফেলছিলেন, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের বাইরের দুনিয়াডা কেমন হইতে পারে—হেই কল্পনাডা আর তাঁর কাছে আছিল না। ওইখানেই তাঁর সীমা।

এইবার আইয়েন জর্জ লুকাচের কথায়। এই লোকডা আছিল এক্কেবারে অন্য মাল। তার হিসাব-নিকাশই আলাদা। তিনি কইতেন, বড় উপন্যাস মানে খালি একজন মানুষের মন খারাপ, দুঃখ-কষ্ট, একাকীত্ব—এইসব না। বড় উপন্যাস মানে একটা সমাজ, একটা সময়, একটা ইতিহাস—সব একসাথে ধরা পড়তে হইব। মানুষরে তার সমাজ থেইকা আলাদা কইরা দেখলে চলব না।

এই লাইগাই কাফকা আর জয়েস—দুইজনের লগেই তার বনিবনা হয় নাই। কাফকার লেখা পড়ে লুকাচ একেবারে কইয়া দিলেন—এইডা একটা “phantom world”। মানে, এক প্রেতলোক। এইহানে মানুষ আছে, ভয় আছে, উদ্বেগ আছে; কিন্তু ইতিহাস কই? সমাজ কই? শ্রেণির টানাপোড়েন কই?

আইজকা এই কথা শুনলে অনেকের গায়ে লাগব। কারণ আইজকা তো কাফকা বিশ্বসাহিত্যের একেবারে মাঝখানে বইসা আছেন। তাই বইলা কি লুকাচরে এককথায় খারিজ কইরা দিমু?

এইখানেই তো আসল ক্যাঁচাল। লুকাচের ঝগড়া কাফকার প্রতিভার লগে আছিল না। ঝগড়া আছিল একটা সাহিত্য-ভাবনার লগে। তার ভয় আছিল—যদি সাহিত্য খালি মানুষের একলা লাগা, ভয় পাওয়া, অস্থিরতার কথাই কয়, তাইলে সমাজটা কই গেল? ইতিহাসটা কই গেল? ক্ষমতার খেলাডা কই গেল? পাঠক কষ্ট দেখব ঠিকই, কিন্তু কষ্টটা ক্যান হইল, সেই হিসাব আর পাইব না। তাই কাফকারে ধইরা টানাটানি কইরা তিনি আসলে আরেকটা সাহিত্য-দর্শন বাঁচাইতে চাইছিলেন।

শেষমেশ ইতিহাস কাফকারে মাথায় তুইলা রাখছে। কিন্তু তাই বইলা লুকাচের কথাগুলা পানিতে গেছে—এইডা কইলে ভুল হইব। বরং বাস্তববাদ আর আধুনিকতাবাদ নিয়া যত তর্ক, ব্যক্তি না সমাজ—এই নিয়া যত ক্যাঁচাল, সবখানেই লুকাচ এখনও ঘুরাফেরা করেন।

এইডাই আমার কাছে সমালোচনার আসল মজা।

সমালোচকের কাম জ্যোতিষীর মতো ভবিষ্যৎ বলা না, মিয়া। তার কাম হইল এমন প্রশ্ন ছুইড়া মারা, যেই প্রশ্নে ঘুম হারাম হয়। তিনি ঠিকও হইতে পারেন, ভুলও হইতে পারেন। কিন্তু প্রশ্নডা যদি না করেন, তাইলে নতুন চিন্তা বাইর হইব কই থেইকা?

অনেক সময় একজন সমালোচকের সবচেয়ে বড় কাম তার দেওয়া উত্তর না; তার করা প্রশ্ন। এমনকি ভুল প্রশ্নও। কারণ ওই প্রশ্নের जवाब খুঁজতে খুঁজতেই নতুন পাঠ, নতুন ব্যাখ্যা, নতুন সাহিত্য-ভাবনার জন্ম হয়। এই লাইগাই আমি কই, সমালোচক বিচারক না; তিনি আড্ডার সবচেয়ে বিপজ্জনক লোক। সবাই যখন একদিকে হাঁটে, তিনি তখন কইয়া ওঠেন—”এইহানে একটু থামেন, হিসাবডা আবার মিলাইয়া দেখি।” ওইখান থেইকাই তর্ক শুরু হয়। আর যেই সাহিত্যে তর্ক নাই, সেই সাহিত্য বেশিদিন বাঁচেও না।

এইবার আইয়েন, এই সব কথা আমাদের নিজের উঠানে নিয়া আসি। শহীদুল জহিররে নিয়া এই যেই এত ক্যাঁচাল, আমার তো মনে হয়, আমরা শুরুতেই ভুল জায়গায় দাঁড়াইতেছি। আরে মিয়া, প্রশ্নডা এইটা না—সালিমুল্লাহ খান ঠিক না ভুল। এইডা তো এক কাপ চায়ের আড্ডার প্রশ্ন।

আসল প্রশ্ন হইল—সালিমুল্লাহ খান কোন সাহিত্য-দর্শনের জায়গা থেইকা শহীদুল জহিররে পড়তেছেন? তাঁর কাছে উপন্যাস মানে কী? ভাষার কাম কী? ইতিহাসের কাম কী? তিনি উপন্যাসে কী খোঁজেন?

আবার উল্টা দিক থেইকাও একই প্রশ্ন।

যারা শহীদুল জহিররে এত ভালোবাসেন, তারা কোন চোখ দিয়া পড়েন? তারা কি ভাষারে খালি গল্প কওয়ার বাহন মনে করেন? নাকি ভাষাই গল্পের আসল ঘটনা—এইডা বিশ্বাস করেন? তারা কি বাস্তববাদ খোঁজেন, নাকি লোকস্মৃতি, গুজব, বহুস্বর, ভাষার বাঁক আর বিচ্যুতির ভিতর দিয়া উপন্যাস বুঝতে চান?

এই প্রশ্নগুলা বাদ দিয়া যদি খালি মানুষ ধরি—”ও ঠিক”, “ও ভুল”, “ওরে নামাও”, “ওরে উঠাও”—তাইলে সাহিত্যরে আমরা ফেসবুকের কমেন্টবক্স বানাইয়া ফেলি।

সাহিত্যের ক্যাঁচাল মানুষে মানুষে না, মিয়া। সাহিত্যের ক্যাঁচাল হয় ভাষায় ভাষায়। নন্দনতত্ত্বে নন্দনতত্ত্বে। ইতিহাস পড়ার এক তরিকার লগে আরেক তরিকার।

একজন সমালোচক যখন একজন লেখকেরে নাকচ করেন, তখন তিনি খালি একজন মানুষরে নাকচ করেন না। তিনি একটা সাহিত্যিক রাস্তা, একটা নন্দনতত্ত্ব, একটা শিল্প-দর্শনের লগে তর্কে নামেন।

আবার একজন লেখকও খালি একটা গল্প লেখেন না। তিনি ভাষার ভিতরে নতুন রাস্তা কাটেন। নতুনভাবে দেখা, নতুনভাবে শোনা, নতুনভাবে ভাবার দরজা খুলেন।

এই লাইগাই আমি শহীদুল জহিররে নিয়া এই তর্কটারে ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি বইলা দেখি না। এইডা আসলে ভাষা বনাম ভাষা। এক নন্দনতত্ত্ব বনাম আরেক নন্দনতত্ত্ব। ইতিহাসরে বুঝার এক কায়দার লগে আরেক কায়দার মোলাকাত। বাকিটা? বাকিটা সময় কইব। ইতিহাস কইব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *