বাংলাদেশের শ্রম খাতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে গত এক দশক ধরে একসঙ্গে কাজ করছে বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক। শিল্পখাতে নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলার প্রয়োজন থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন দুই দেশের শ্রম পরিদর্শন সংস্থার মধ্যে একটি কৌশলগত ও আস্থাভিত্তিক অংশীদারত্বে পরিণত হয়েছে।
ডেনমার্কের শ্রম পরিবেশ কর্তৃপক্ষ (ডেনিশ ওয়ার্কিং এনভায়রনমেন্ট অথরিটি) এবং বাংলাদেশের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর যৌথভাবে ‘স্ট্র্যাটেজিক সেক্টর কো-অপারেশন অন অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথ’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর মাধ্যমে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষ জনবল তৈরি এবং আধুনিক পরিদর্শন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তৈরি পোশাক শিল্পে অতীতের বিভিন্ন দুর্ঘটনা বাংলাদেশের শ্রম নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। সেই প্রেক্ষাপটে ডেনমার্কের কারিগরি সহায়তা ও অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
গত ১০ বছরে এই সহযোগিতার ফলে ঝুঁকি মূল্যায়নভিত্তিক আধুনিক পরিদর্শন ব্যবস্থা চালুর অগ্রগতি হয়েছে। কর্মক্ষেত্রের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ে আটটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ দক্ষতা তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ উপকরণসহ একটি জাতীয় গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা হয়েছে।
এছাড়া প্রশিক্ষকদের একটি দক্ষ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। তারা এখন কারখানা, কর্মক্ষেত্র এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ে নিরাপত্তা বিষয়ক জ্ঞান ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
এই এক দশকের অর্জন ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে সম্প্রতি ঢাকায় “টেন ইয়ারস অফ বিল্ডিং সেফ এন্ড ফেয়ার ওয়ার্কপ্লেসেস-সাসটেইনিং দ্য মোমেন্টাম” শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশে ডেনমার্ক দূতাবাস এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুর রহমান তারফদার। এছাড়া ডিআইএফইর মহাপরিদর্শক ফারহাদ সিদ্দিকী, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী, শ্রমিক সংগঠনের নেতা এবং নীতিনির্ধারকরা অংশ নেন।
অংশগ্রহণকারীরা গত এক দশকের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক দলের সদস্যদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সনদ প্রদান করা হয়।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় টেকসই উন্নতি অর্জনের জন্য জাতীয় মালিকানা, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ধারাবাহিক সহযোগিতা অপরিহার্য।
ডেনমার্ক জানিয়েছে, বাংলাদেশের শ্রম খাতের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে তারা ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। গত এক দশকের সাফল্য আগামী দিনের উন্নয়নের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে।
এদিকে বাংলাদেশে শ্রম অধিকার, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ডেনমার্ক ও তার অংশীদারদের অবদান তুলে ধরতে “টেন ইয়ারস বিল্ডিং সেফ এন্ড ফেয়ার ওয়ার্কপ্লেসেস” শীর্ষক একটি ই-প্রকাশনা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে গত এক দশকের অভিজ্ঞতা, অর্জন, শিক্ষণীয় বিষয় এবং ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকারের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
নিরাপদ কর্মপরিবেশ শুধু শ্রমিকের জীবন রক্ষা করে না; এটি উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা শক্তিশালী করে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বাংলাদেশ-ডেনমার্ক সহযোগিতার এই উদ্যোগকে শ্রম খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।