উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। প্রতিবছর কোটি কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন এবং এর চিকিৎসায় ব্যয় হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। কিন্তু এবার এক নতুন গবেষণা দেখিয়েছে যে, রান্নাঘরে সহজলভ্য এক ফোঁটা পেপারমিন্ট অয়েল উচ্চ রক্তচাপ কমাতে পারে অবিশ্বাস্য রকম কার্যকরভাবে।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সেন্ট্রাল ল্যাঙ্কাশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের পরিচালিত একটি নিয়ন্ত্রিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান জার্নাল PLOS ONE-এ। এই গবেষণায় ৪০ জন প্রাপ্তবয়স্ক (১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী) অংশগ্রহণকারীকে দুটি গ্রুপে ভাগ করা হয়, যাদের সবারই ছিল “প্রি-হাইপারটেনশন” বা “স্টেজ ওয়ান হাইপারটেনশন”।
প্রথম গ্রুপকে প্রতিদিন দুইবার করে প্রতিবার ১০০ মাইক্রোলিটার পেপারমিন্ট অয়েল খেতে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় গ্রুপকে দেওয়া হয় পেপারমিন্টের স্বাদযুক্ত একটি প্লাসেবো (যাতে কোনো সক্রিয় উপাদান ছিল না)।
– যারা পেপারমিন্ট অয়েল খেয়েছিলেন, তাদের সিস্টোলিক রক্তচাপ গড়ে ৮.৫ মিলিমিটার মার্কুরি পর্যন্ত কমেছিল।
– প্লাসেবো গ্রুপে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।
– মাত্র ২০ দিনের নিয়মিত সেবনেই এই পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।
গবেষণার প্রধান লেখক ড. জনি সিনক্লেয়ার বলেন, “রক্তচাপ মাত্র কয়েক মিলিমিটার মার্কুরি কমলেও জনসংখ্যার স্তরে তা হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে।”
পেপারমিন্ট অয়েলের মূল কার্যকরী উপাদান হলো মেনথল এবং ফ্লাভনয়েডস । এই যৌগগুলোর রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বৈশিষ্ট্য।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এগুলো শরীরের রক্তনালীর পেশীগুলোকে শিথিল করে, রক্তপ্রবাহ সহজ করে এবং প্রদাহ কমায়— যার ফলে রক্তচাপ প্রাকৃতিকভাবেই কমতে শুরু করে। এছাড়াও, এটি হৃদপিন্ডের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ রক্তচাপ বিশ্বের সবচেয়ে বড় “নীরব ঘাতক”। এর কোনো লক্ষণ থাকে না, কিন্তু ধীরে ধীরে এটি হৃদপিন্ড, মস্তিষ্ক ও কিডনিকে ধ্বংস করে দেয়। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। চিকিৎসায় ব্যবহৃত রাসায়নিক ওষুধ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যয় একটি বড় বোঝা। সেখানে পেপারমিন্ট অয়েল:
– ✅ সস্তা ও সহজলভ্য
– ✅ কম ক্যালরিযুক্ত
– ✅ প্রাকৃতিক ও নিরাপদ (নির্দিষ্ট মাত্রায়)
– ✅ ব্যবহারে সহজ— খাবারের সঙ্গে বা সরাসরি সেবনযোগ্য
গবেষকরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, এটি কোনোভাবেই চিকিৎসকের পরামর্শ বা নির্ধারিত ওষুধের বিকল্প নয়। বিশেষ করে:
– যারা ইতোমধ্যে রক্তচাপের ওষুধ খাচ্ছেন, তাদের অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
– ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার (যেমন আমলোডিপিন) খাওয়া রোগীদের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কারণ দুটি একসঙ্গে নিলে রক্তচাপ অতিরিক্ত কমে গিয়ে হাইপোটেনশন হতে পারে।
– গর্ভবতী মহিলা, কিডনি রোগী এবং ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য এটি নির্দিষ্ট মাত্রায় ব্যবহার করা উচিত।
বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, তেল-চর্বিযুক্ত খাবার এবং মানসিক চাপ এর প্রধান কারণ। এমন পরিস্থিতিতে পেপারমিন্ট অয়েল একটি আশার আলো হতে পারে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে চিকিৎসার সুবিধা সীমিত, সেখানে এই সহজলভ্য প্রাকৃতিক উপাদানটি স্বাস্থ্য সচেতনতার অংশ হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, এটি একটি সহায়ক চিকিৎসা। সুস্থ জীবনযাপন, নিয়মিত ব্যায়াম, লবণ কম খাওয়া এবং নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা— এই তিনটি নিয়মের কোনো বিকল্প নেই।
গবেষণায় ব্যবহৃত মাত্রা ছিল প্রতিদিন দুইবার, প্রতিবার ১০০ মাইক্রোলিটার (প্রায় ২০ ফোঁটার কম)। তবে যেকোনো নতুন সাপ্লিমেন্ট শুরুর আগে অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন।
—
সূত্র: ইরনা (IRNA), Medical Xpress, PLOS ONE জার্নাল, এবং Springer Nature-এর সিস্টেম্যাটিক রিভিউ।