ঈদুল আজহা মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এ দিনের মূল আমল হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করা। তবে প্রতি বছর ঈদুল আজহার সময় বিশেষ করে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে কোরবানির পশু জবাই, রক্ত ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
ইসলামী বিধান অনুযায়ী কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব। নিজের পশু নিজ হাতে জবাই করা মুস্তাহাব। নিজে জবাই করতে না পারলে অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে জবাইয়ের সময় উপস্থিত থাকা এবং কোরবানি প্রত্যক্ষ করাও মুস্তাহাব বলে উল্লেখ করেছেন ইসলামী চিন্তাবিদরা।
তবে জনসমক্ষে পশু জবাই করা বা সবাইকে জবাইয়ের দৃশ্য দেখানোকে ইসলামের কোনো বিশেষ ফজিলতপূর্ণ আমল হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। শিশু, নারী বা সাধারণ মানুষের সামনে পশু জবাই করাকে ধর্মীয়ভাবে উৎসাহিত করারও কোনো নির্দেশনা নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া, আত্মত্যাগ এবং আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ। পশু জবাইয়ের দৃশ্য প্রদর্শন করা নয়। পবিত্র কোরআনেও বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না; পৌঁছায় মানুষের তাকওয়া।
পরিবেশবিদদের মতে, কোরবানির পশুর রক্ত ও বর্জ্যের ধর্মীয় গুরুত্ব থাকলেও এগুলো নিজে পবিত্র বস্তু নয়। অন্যান্য পশুর রক্ত ও বর্জ্যের মতোই এগুলো দ্রুত অপসারণ না করলে পরিবেশ দূষণ, দুর্গন্ধ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ঈদের দিন লাখ লাখ পশু কোরবানি হওয়ার ফলে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয়। অনেক এলাকায় সময়মতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত না হলে রাস্তাঘাট নোংরা হয়ে যায়। বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট স্থানে কোরবানি করার পক্ষে মত দিয়ে আসছেন। তাদের মতে, আবাসিক এলাকার ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পশু জবাইয়ের পরিবর্তে নির্ধারিত মাঠ, কোরবানি কেন্দ্র বা আধুনিক স্লটার হাউস ব্যবহার করলে পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে ইতোমধ্যে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বিশেষ করে নগর এলাকায় নির্দিষ্ট স্থানে পশু জবাইয়ের ব্যবস্থা করে পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ধর্মীয় শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করেন, কোরবানির প্রকৃত আমল হলো নির্ধারিত সময়ে পশু জবাই করা, গোশতের একটি অংশ নিজে খাওয়া এবং আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে বণ্টন করা। এর বাইরে রাস্তাঘাট রক্ত ও বর্জ্যে ভরে ফেলা কিংবা জনসমক্ষে জবাই প্রদর্শন করাকে ধর্মীয় আমল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তাদের মতে, আধুনিক নগর জীবনের বাস্তবতায় কোরবানির ধর্মীয় বিধান পালন এবং পরিচ্ছন্ন নগর পরিবেশ রক্ষা—দুই বিষয়ই একসঙ্গে নিশ্চিত করা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন সচেতনতা, পরিকল্পনা এবং কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা।
ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা আত্মত্যাগ ও মানবকল্যাণ। তাই কোরবানির ইবাদত পালনের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা, জনস্বাস্থ্য এবং প্রতিবেশীর স্বস্তির বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।