ঢাকায় আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, ৭৫ বছর আগে জমিদারী প্রথা আইনিভাবে বিলুপ্ত হলেও রাষ্ট্র, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় সেই শোষণমূলক মানসিকতা এখনো বহাল রয়েছে। কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ নাগরিকের প্রকৃত মুক্তির জন্য তাই শুধু আইনের নয়, রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থারও মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন।
শনিবার (১৬ই মে) সকালে “জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের ৭৫ বছর: পরিপ্রেক্ষিত এবং বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা” শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। রাজধানীতে সংগঠনটির প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক, আইন, গবেষণা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনের সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ূম বলেন, বাংলার জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের পেছনে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও আন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে। তিনি বলেন, এ. কে. ফজলুল হক ১৯৩৬ সালে কৃষক প্রজা পার্টি গঠন করে “লাঙল যার, জমি তার” স্লোগানকে সামনে আনেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলার কৃষক প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক স্বীকৃতি পায়।
তিনি আরও বলেন, ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর ফজলুল হক জমিদারী ব্যবস্থার ভিত্তি পর্যালোচনার জন্য ১৯৩৮ সালে ফ্লাউড কমিশন গঠন করেন। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালের স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্টের মাধ্যমে পূর্ববাংলায় জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হয়। তার ভাষায়, “বাংলায় জমিদারী প্রথার কফিনে শেষ পেরেকটি মূলত শেরে বাংলার হাত দিয়েই ঠোকা হয়েছিল।”
তবে বক্তারা বলেন, জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হলেও সমাজ ও রাষ্ট্রে তার মানসিকতা টিকে আছে। হাসনাত কাইয়ূম বলেন, জলমহাল, চা বাগান ও হাটবাজারে এখনো এক ধরনের ইজারাদারী শাসন চলছে, যেখানে ইজারাদাররা “নব্য জমিদারের” ভূমিকা পালন করছেন। তিনি এসব ব্যবস্থারও অবসানের দাবি জানান।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ বলেন, তেভাগা আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা। তার মতে, “জমিদারী প্রথা এখন শ্রমদারী প্রথায় রূপ নিয়েছে।” তিনি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেন।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার মোকছেদুল ইসলাম বলেন, ঔপনিবেশিক আমলের আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো এখনো বহাল থাকায় শোষণের সংস্কৃতি টিকে আছে। তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন এবং আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর সংস্কারের আহ্বান জানান।
লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ বলেন, কৃষকদের দীর্ঘ সংগ্রামের ফলেই জমিদারী উচ্ছেদ আইন কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু আজও নগরকেন্দ্রিক পুঁজিপতি ও আমলাতন্ত্র গ্রামীণ জনপদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। তার মতে, নাগরিকরা এখনো নিজেদের ভূমিতেই কোণঠাসা অবস্থায় আছেন।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন রাষ্ট্রচিন্তক মঞ্জুর কাদির, অহিংস গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশ-এর সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম চৌধুরী, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নির্বাহী কমিটির সদস্য হরিপদ দাস এবং সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ সোহেল। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া।
বক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জমিদারী উচ্ছেদের আন্দোলন যেমন দীর্ঘ সময়ের সংগ্রামের ফল ছিল, তেমনি নাগরিক অধিকার, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্র সংস্কারের লড়াইও এখনো চলমান। তাদের মতে, সংবিধান ও রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কারের মধ্য দিয়েই সেই লড়াইয়ের পরবর্তী অগ্রগতি সম্ভব।