বিশ্বের আবহাওয়ায় বড় পরিবর্তনের আশঙ্কা, খরা-বন্যা-ঝড়ের ঝুঁকি বাড়ছে

২০২৬ সালের মধ্যভাগ থেকে বিশ্ব আবহাওয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস বলছে, প্রশান্ত মহাসাগরে একটি শক্তিশালী এল নিনো গঠিত হতে পারে। এটি গত ১৪০ বছরের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিজ্ঞানীরা।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, মে থেকে জুলাই ২০২৬-এর মধ্যে এল নিনো শুরু হওয়ার সম্ভাবনা ৬১ শতাংশ। বছরের শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব স্থায়ী হতে পারে।

ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টস -এর দীর্ঘমেয়াদি মডেল দেখাচ্ছে, বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের কেন্দ্রীয় অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হতে পারে। এমন পরিস্থিতি ১৮৭৭ ও ২০১৫ সালের শক্তিশালী এল নিনোর রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। এ সময় সমুদ্রের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের পানি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে। এর ফলে বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধারা বদলে যায়।

এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাসহ বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলের আবহাওয়ায় এর প্রভাব পড়ে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র হচ্ছে।

প্যারিস চুক্তির ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা। নতুন এল নিনো যুক্ত হলে বিশ্ব গড় তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে। এতে নতুন তাপমাত্রা রেকর্ড সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল -এর ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভবিষ্যতে চরম এল নিনো ও লা নিনা ঘটনার তীব্রতা আরও বাড়তে পারে।

এল নিনোর সময় উষ্ণ সমুদ্রপানি ঝড়ের জন্য অতিরিক্ত শক্তি সরবরাহ করে। একই সঙ্গে বায়ুর গতিপথে এমন পরিবর্তন ঘটে, যা ঘূর্ণিঝড় ও হারিকেনের বিকাশকে সহায়তা করে।

আবহাওয়া বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালে পূর্ব ও মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে ঝড়ের তৎপরতা বাড়তে পারে। এতে ক্যালিফোর্নিয়া, হাওয়াই এবং মেক্সিকো বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।

কিছু পূর্বাভাসে এটিকে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রশান্ত মহাসাগরে ঝড় বাড়লেও আটলান্টিক অঞ্চলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

এল নিনোর কারণে আটলান্টিকের উপরের স্তরে বায়ুর গতিবেগ বেড়ে যায়। এতে ঝড়ের গঠন বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে আটলান্টিক হারিকেন মৌসুম গড়ের তুলনায় কিছুটা কম সক্রিয় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, কম ঝড় মানেই ঝুঁকি শেষ নয়। একটি শক্তিশালী ঝড়ও বড় ক্ষতি করতে পারে।

এল নিনোর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে শীতকালে বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়াসহ কিছু অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি বাড়বে।

অন্যদিকে মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি সতর্ক করেছে, এতে কৃষি উৎপাদন কমবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।

দক্ষিণ আমেরিকায়ও বিপরীতধর্মী চিত্র দেখা যেতে পারে। ব্রাজিলের দক্ষিণাঞ্চল, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও চিলিতে অতিবৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

ভারতের জন্য এল নিনো সবসময়ই উদ্বেগের বিষয়। কারণ এটি সাধারণত বর্ষাকে দুর্বল করে দেয়।

দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতের অনেক বড় খরার সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনোর সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৬ সালেও একই ধরনের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াতেও বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে। এতে বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়বে। ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর সময় ইন্দোনেশিয়ায় ব্যাপক দাবানল সৃষ্টি হয়েছিল। এর ধোঁয়ায় লাখো মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছিল।

পূর্ব এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপাঞ্চলেও টাইফুনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

পূর্ব আফ্রিকার কেনিয়া, সোমালিয়া ও ইথিওপিয়ায় অতিবৃষ্টি ও বন্যা হতে পারে। এর ফলে কলেরাসহ পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার কয়েকটি দেশে খরা দেখা দিতে পারে। কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

আগের শক্তিশালী এল নিনোগুলোতে এই অঞ্চলে কোটি কোটি মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে এল নিনোর পূর্বাভাস আগের চেয়ে কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

আগের শতাব্দীর জলবায়ু পরিস্থিতি আর বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তাই আবহাওয়াবিদরা এখন নতুন পদ্ধতিতে তথ্য বিশ্লেষণ করছেন।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, বসন্তকালীন পূর্বাভাসে কিছু অনিশ্চয়তা থাকলেও আগামী মাসগুলোতে পূর্বাভাসের নির্ভুলতা আরও বাড়বে।

আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে আগাম প্রস্তুতির ওপর জোর দিচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে আগেভাগে তহবিল বরাদ্দ, খাদ্য মজুত, পানি ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালের এল নিনো শুধু একটি আবহাওয়া ঘটনা নয়। এটি বৈশ্বিক কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, পানি সম্পদ এবং অর্থনীতির ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্ব যখন ক্রমেই উষ্ণ হচ্ছে, তখন একটি শক্তিশালী এল নিনো সেই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। তাই এখনই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। কারণ ২০২৬ সালের এল নিনো বিশ্বের আবহাওয়ার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *