পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে মিয়ানমারের সামরিক হেফাজতে থাকা অং সান সু চিকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ছিল গভীর অনিশ্চয়তা। তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। আইনজীবীরাও নিয়মিত দেখা করার সুযোগ পাননি। আন্তর্জাতিক মহলও তাঁর অবস্থান ও স্বাস্থ্যের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাচ্ছিল না।
এই পরিস্থিতিতে ৩রা আগস্ট নেপিদোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সেই অনিশ্চয়তায় কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) মিয়ানমার প্রতিনিধি আর্নো দ্য বেক সু চির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করেছেন। পরে মিয়ানমারের সামরিক সমর্থিত সরকার ওই সাক্ষাতের কয়েকটি ছবি প্রকাশ করে।
ছবিতে ৮১ বছর বয়সী সু চিকে রেড ক্রস প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলতে এবং হাত মেলাতে দেখা যায়। এতে অন্তত একটি বিষয় নিশ্চিত হয়েছে—সু চি জীবিত আছেন।
তবে এর বেশি কিছু এখনো নিশ্চিত নয়। তাঁর স্বাস্থ্য, আটকের প্রকৃত পরিবেশ কিংবা মুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আইসিআরসি কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। সংস্থাটি জানিয়েছে, বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাতের নিজস্ব নিয়ম ও পদ্ধতি অনুযায়ী এই বৈঠক হয়েছে। সু চির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার সুযোগও ছিল। তাদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ কেবল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গোপনে আলোচনা করা হয়।
২০২১ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের পর অং সান সু চিকে আটক করা হয়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হয়। এসব মামলায় দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাঁকে।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে সামরিক সরকার দাবি করে, তাঁর সাজা কমানো হয়েছে এবং তাঁকে কারাগার থেকে গৃহবন্দিত্বে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরিবার এ তথ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে।
সু চির ছেলে কিম অ্যারিস জুনে লন্ডনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মিয়ানমার সরকারের কাছে সরাসরি তাঁর মায়ের জীবিত থাকার প্রমাণ দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, প্রায় দুই বছর ধরে তিনি মায়ের কাছ থেকে কোনো চিঠি বা যোগাযোগ পাননি।
অ্যারিসের উদ্বেগের পেছনে ছিল আরও একটি কারণ। তাঁর মা ৮০ পেরিয়েছেন। দীর্ঘ বন্দিজীবন এবং বয়সজনিত নানা শারীরিক সমস্যার কথা পরিবার আগে জানিয়েছিল।
সু চির জীবিত থাকার বিষয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ এতটাই বেড়েছিল যে তাঁর ৮১তম জন্মদিনকে কেন্দ্র করেও ‘প্রুফ অব লাইফ’ দাবিটি নতুন করে সামনে আসে।
৩রা আগস্টের রেড ক্রস সাক্ষাৎ সেই দাবির একটি আংশিক জবাব দিয়েছে।
কিম অ্যারিসও ঘটনাটিকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তিনি এটিকে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখছেন না। তাঁর দাবি, পরিবারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা স্বাস্থ্য-তথ্য নিশ্চিত করতে হবে।
রেড ক্রসের সঙ্গে সাক্ষাৎকে সাধারণ রাজনৈতিক বৈঠক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আইসিআরসি সংঘাত ও বন্দিদশার পরিস্থিতিতে আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করে। এ ধরনের সাক্ষাতে সংস্থাটি সাধারণত বন্দির অবস্থার বিষয়ে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করে। তবে সেই তথ্য প্রকাশ করে না।
এ কারণেই ৩রা আগস্টের সাক্ষাৎটির রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে।
সু চির সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাওয়ার অর্থ হলো সামরিক কর্তৃপক্ষ অন্তত একজন আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিকে তাঁর কাছে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। একই সঙ্গে ছবিগুলো প্রকাশ করে সরকার নিজেই ঘটনাটিকে জনসমক্ষে এনেছে।
এখানেই প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি নিছক মানবিক পদক্ষেপ, নাকি এর পেছনে রয়েছে কূটনৈতিক হিসাব?
সাক্ষাতের সময়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
২০২৬ সালে মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্ব আঞ্চলিক কূটনীতিতে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। মিন অং হ্লাইং এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। এর পর তিনি প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নেন।
আগস্টের শুরুতে তাঁর থাইল্যান্ড সফরও ছিল সেই প্রচেষ্টার অংশ। থাইল্যান্ড প্রকাশ্যেই মিয়ানমার ও আসিয়ানের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে। জুলাইয়ে থাই সরকার জানিয়েছিল, মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং দেশটিকে আসিয়ানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে তারা ভূমিকা রাখতে চায়।
৫ই আগস্ট থাইল্যান্ড সফরে মিন অং হ্লাইংকে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়। তাঁর সফরকে মিয়ানমারের আঞ্চলিক বৈধতা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সু চির সঙ্গে রেড ক্রসের সাক্ষাৎকে আলাদা করে দেখা কঠিন।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সঙ্গে আসিয়ানের সম্পর্কও জটিল হয়ে পড়ে। সামরিক নেতৃত্বকে উচ্চপর্যায়ের আসিয়ান বৈঠকে পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হয়নি।
এর মূল কারণ ছিল মিয়ানমার সংকট মোকাবিলায় ২০২১ সালে গৃহীত ফাইভ-পয়েন্ট কনসেনসাস বা পাঁচ দফা ঐকমত্য বাস্তবায়নে সামরিক সরকারের ব্যর্থতা।
এই পরিকল্পনায় সহিংসতা বন্ধ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ, আসিয়ানের বিশেষ দূতের মাধ্যমে মধ্যস্থতা, মানবিক সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু পাঁচ বছর পরও আসিয়ানের ভেতরে এ নিয়ে হতাশা রয়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে মিয়ানমার নিয়ে আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য সম্ভাব্য মানদণ্ড নিয়ে আলোচনা করেন। একই সময়ে মিয়ানমারের সামরিক সরকার দাবি করেছে, তারা নিজেদের উদ্যোগে আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায় এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখেই সহযোগিতা করবে।
অর্থাৎ, দুই পক্ষের অবস্থান এখনো মৌলিকভাবে আলাদা।
মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাছে রেড ক্রসের সাক্ষাৎ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রমাণ নয়।
অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্সসহ বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে।
তাদের দৃষ্টিতে একজন আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিকে সু চির সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়া ইতিবাচক হলেও এতে মূল সমস্যা বদলায়নি।
সু চি এখনো স্বাধীন নন। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নেই। পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মিয়ানমারে সংঘাতও শেষ হয়নি।
ফলে একটি সাক্ষাৎকে রাজনৈতিক সমঝোতার সূচনা হিসেবে দেখার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই।
এখানেই ৩রা আগস্টের ঘটনাটির কূটনৈতিক দিকটি সামনে আসে।
সু চির সঙ্গে রেড ক্রসের সাক্ষাতের ছবি প্রকাশ করে সামরিক সরকার একসঙ্গে কয়েকটি বার্তা দিতে পেরেছে।
প্রথমত, সু চি জীবিত—এমন একটি আন্তর্জাতিক প্রশ্নের জবাব তারা দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, তারা দেখাতে চেয়েছে যে সু চি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন অবস্থায় নেই এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার একজন প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা করার সুযোগ রয়েছে।
তৃতীয়ত, আসিয়ান ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনায় তারা নিজেদের আরও সহযোগিতাপ্রবণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে মিয়ানমারের সামরিক সরকার আসিয়ানের পাঁচ দফা ঐকমত্য মেনে নিয়েছে। বরং সাম্প্রতিক সরকারি বক্তব্যে তারা ওই কাঠামো নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে এবং নিজেদের ‘মিয়ানমার-নেতৃত্বাধীন’ প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়েছে।
সু চির সঙ্গে রেড ক্রসের সাক্ষাৎ আসিয়ানের জন্যও একটি কূটনৈতিক পরীক্ষা তৈরি করেছে।
একদিকে, একজন ৮১ বছর বয়সী রাজনৈতিক বন্দির সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার সাক্ষাৎকে স্বাগত জানানো সহজ।
অন্যদিকে, এটিকে যদি মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতির স্বাভাবিকীকরণের প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়, তাহলে আসিয়ানের ওপর চাপ বাড়বে।
কারণ সংকটের মূল প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত।
সহিংসতা বন্ধ হয়নি। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি হয়নি। বিরোধী পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর রাজনৈতিক সংলাপও শুরু হয়নি।
জুলাইয়ের শেষ দিকে মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের একটি জোট আসিয়ানের কাছে স্পষ্ট ও সময়সীমাবদ্ধ মানদণ্ড নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের প্রস্তাবের মধ্যে ছিল সহিংসতা বন্ধ এবং সু চিসহ সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি।
সু চির সঙ্গে রেড ক্রসের সাক্ষাৎ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ঘটনা।
দীর্ঘ সময় পর তাঁর একটি আন্তর্জাতিক যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকাশিত ছবিগুলোও তাঁর জীবিত থাকার বিষয়ে সবচেয়ে স্পষ্ট সাম্প্রতিক প্রমাণ।
কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ নয়।
বরং এখন আরও কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। সু চির পরিবারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ কি দেওয়া হবে? তাঁর স্বাস্থ্যের স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন কি সম্ভব হবে? তাঁকে কি মুক্তি দেওয়া হবে?
মিয়ানমারের অন্য রাজনৈতিক বন্দিদের কী হবে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সামরিক সরকার কি সত্যিই রাজনৈতিক সমঝোতার পথে হাঁটবে, নাকি আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কমানোর জন্য সীমিত কিছু পদক্ষেপ নিয়েই থেমে থাকবে?
বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিকেই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কারণ রেড ক্রসের একটি সাক্ষাৎ মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংকটের কাঠামো বদলে দেয়নি। এটি শুধু দীর্ঘ নীরবতার মধ্যে একটি জানালা খুলেছে।
সেই জানালা দিয়ে আপাতত যা দেখা যাচ্ছে, তা হলো—অং সান সু চি জীবিত আছেন।
কিন্তু তিনি কতটা নিরাপদ, কতটা সুস্থ এবং তাঁর ভবিষ্যৎ কী—সেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অন্ধকারেই রয়ে গেছে।