‘ডিমেনশিয়া’ বা জ্ঞানহানি শব্দটি শুনলেই বেশির ভাগ মানুষের মনে প্রথম যে বিষয়টি আসে, তা হলো ভুলে যাওয়া। পরিচিত মানুষের নাম মনে না থাকা, ঘরের জিনিসপত্র কোথায় রাখা হয়েছে তা ভুলে যাওয়া কিংবা অতীতের স্মৃতি হারিয়ে ফেলা—এসবই সাধারণ ধারণায় জ্ঞানহানির লক্ষণ। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, বাস্তবতা আরও বিস্তৃত এবং জটিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিমেনশিয়া কোনো একক রোগ নয়; এটি ১০০টিরও বেশি ভিন্ন রোগের একটি সমষ্টিগত নাম। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো আলঝেইমার রোগ, যা প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়। তবে বাকি ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে এমন কিছু বিরল ও জটিল প্রকারভেদ রয়েছে, যেগুলোর লক্ষণ সাধারণ মানুষের ধারণার বাইরেও হতে পারে।
ডিমেনশিয়ার এমন চারটি দুর্লভ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ধরন, যেগুলোর প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়।
চোখে সমস্যা, অথচ চোখে রোগ নেই
পোস্টেরিয়র কর্টিক্যাল অ্যাট্রোফি (PCA)
ডিমেনশিয়ার এই ধরনটি প্রথম দিকে স্মৃতিকে নয়, বরং দৃষ্টিশক্তি ও স্থান-সংক্রান্ত বোধশক্তিকে আঘাত করে। রোগটির নাম পোস্টেরিয়র কর্টিকাল অ্যাট্রোফি।
আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, বই পড়তে গেলে শব্দগুলো ঠিকমতো বোঝা যায় না কিংবা লাইন ধরে পড়তে সমস্যা হয়। অনেকের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় গভীরতা বা দূরত্ব বুঝতে সমস্যা হয়, ফলে হোঁচট খাওয়ার ঘটনাও ঘটে। কেউ কেউ পরিচিত পথেও হারিয়ে যান, যদিও তাদের স্মৃতিশক্তি তখনো মোটামুটি স্বাভাবিক থাকে। গাড়ি চালানোর সময় দূরত্ব নির্ধারণেও অসুবিধা দেখা দেয়।
সাধারণত ৫৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সীদের মধ্যে এই রোগের সূচনা হয়। অনেক রোগী প্রথমে চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যান। কিন্তু পরীক্ষায় চোখে তেমন কোনো সমস্যা ধরা পড়ে না। কারণ, সমস্যাটি আসলে চোখে নয়—মস্তিষ্কের সেই অংশে, যেখানে দৃষ্টির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
দ্রুত অবনতি: কয়েক মাসেই ভয়াবহ পরিবর্তন
ক্রয়েটজফেল্ড-জ্যাকব ডিজিজ (সিজেডি)
ক্রয়েটজফেল্ড-জ্যাকব ডিজিজ ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে বিরল ও ভয়াবহ ধরনগুলোর একটি। প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে গড়ে মাত্র একজন এই রোগে আক্রান্ত হন। কিন্তু এর ভয়াবহতা হলো, এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়।
যেখানে অনেক ধরনের ডিমেনশিয়া ধীরে ধীরে বাড়ে, সেখানে এই রোগে কয়েক মাসের মধ্যেই স্মৃতিশক্তি ও মানসিক সক্ষমতার নাটকীয় অবনতি হতে পারে।
রোগটির লক্ষণের মধ্যে রয়েছে হঠাৎ শরীরের বিভিন্ন অংশ অনিয়ন্ত্রিতভাবে নড়ে ওঠা, মাংসপেশিতে টান বা সংকোচন, চলাফেরায় ভারসাম্যহীনতা এবং আচরণ বা মনোভাবের অস্বাভাবিক পরিবর্তন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়স্কদের পাশাপাশি যাদের পরিবারে এ ধরনের রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এ ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যখন ডিমেনশিয়ার সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়ে শরীরও
ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া-মোটর নিউরন ডিজিজ (FTD-MND)
জ্ঞানহানির এই ধরনটি শুধু মস্তিষ্ককেই নয়, ধীরে ধীরে শরীরের মাংসপেশিকেও দুর্বল করে ফেলে। রোগটির নাম ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া-মোটর নিউরন ডিজিজ।
আক্রান্ত ব্যক্তির হাত-পায়ের মাংসপেশি ক্রমে পাতলা ও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। অনেকের পেশি শক্ত হয়ে যায়, চলাফেরা কঠিন হয়ে পড়ে। খাবার গিলতে সমস্যা হওয়া, কথার উচ্চারণ বদলে যাওয়া এবং আচরণে হঠাৎ পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে।
কিছু রোগী হঠাৎ উদাসীন হয়ে পড়েন, আবার কেউ অস্বাভাবিক রাগী বা আক্রমণাত্মক আচরণ করতে শুরু করেন। পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় এসব পরিবর্তনকে বয়সজনিত স্বাভাবিক দুর্বলতা হিসেবে ধরে নেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, শারীরিক দুর্বলতার সঙ্গে আচরণগত পরিবর্তন দেখা দিলে তা গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত।
বারবার পড়ে যাওয়া কি শুধু বার্ধক্যের লক্ষণ?
প্রোগ্রেসিভ সুপ্রানিউক্লিয়ার পালসি (PSP)
প্রোগ্রেসিভ সুপ্রানিউক্লিয়ার পালসি এমন একটি বিরল রোগ, যা একই সঙ্গে ডিমেনশিয়া ও শারীরিক অক্ষমতার কারণ হতে পারে। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো চোখের নড়াচড়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়া।
রোগীরা অনেক সময় চোখ ঠিকমতো ওপর-নিচ বা ডানে-বামে ঘোরাতে পারেন না। বারবার পড়ে যাওয়া বা ভারসাম্য হারানোও এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
এ ছাড়া হাঁটার ধরনে পরিবর্তন, পা শক্ত হয়ে যাওয়া, মুখের অভিব্যক্তি কমে যাওয়া এবং কথা ধীরে বা অস্পষ্টভাবে বলার মতো সমস্যাও দেখা দেয়।
চিকিৎসকেরা বলছেন, এই রোগে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পাওয়া বা হাড় ভাঙার ঝুঁকি বেশি থাকে। অথচ অনেকেই এটিকে সাধারণ বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা ভেবে গুরুত্ব দেন না।
যে লক্ষণগুলো অবহেলা করা ঠিক নয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিমেনশিয়ার লক্ষণ সব সময় স্মৃতিভ্রংশ দিয়ে শুরু হয় না। নিচের কিছু পরিবর্তন সতর্কবার্তা হতে পারে—
| লক্ষণ | সম্ভাব্য ইঙ্গিত |
|---|---|
| রাতের পর আচরণ বা ব্যবহারিক পরিবর্তন | ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়ার প্রাথমিক সংকেত |
| চোখে সমস্যা, কিন্তু চশমা বদলালেও উপকার না হওয়া | পোস্টেরিয়র কর্টিক্যাল অ্যাট্রোফি |
| বারবার পড়ে যাওয়া বা ভারসাম্য হারানো | PSP বা PCA |
| হঠাৎ মাংসপেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া | FTD-MND |
| কথাবলার ধরনে আকস্মিক পরিবর্তন | বিভিন্ন ধরনের ডিমেনশিয়া |
| কয়েক মাসের মধ্যে দ্রুত স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া | CJD |
বর্তমানে ডিমেনশিয়ার কোনো ধরনেরই চূড়ান্ত নিরাময় নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা গেলে রোগের গতি ধীর করা, রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং পরিবারকে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে সহায়তা করা সম্ভব।
ডিমেনশিয়া শুধু একজন রোগীর ব্যক্তিগত লড়াই নয়; এটি পরিবার, সমাজ এবং স্বাস্থ্যসচেতনতারও একটি বড় পরীক্ষা।