থাইল্যান্ডে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন শ্রমবাজারের সম্ভাবনা

স্বচ্ছ ও কম খরচের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জোর, বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ‘ব্লু কলার’ ও ‘হোয়াইট কলার’ চাকরির সুযোগ তৈরির উদ্যোগ

থাইল্যান্ডে কর্মী সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটির একটি প্রতিনিধি দল। বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে থাইল্যান্ডের শ্রম বিষয়ক সিনেট স্ট্যান্ডিং কমিটির একটি প্রতিনিধি দলের সৌজন্য সাক্ষাতে এ আলোচনা হয়। বৈঠকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হকসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

থাই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির শ্রম বিষয়ক সিনেট স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান নিতরুত্তি সুথিনন। তিনি জানান, থাইল্যান্ড বর্তমানে চারটি দেশের সঙ্গে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ। তবে কম্বোডিয়ার সঙ্গে সাম্প্রতিক সীমান্ত উত্তেজনার কারণে দেশটি থেকে নির্মাণ, হালাল খাদ্য কারখানা ও কৃষি খাতে কর্মী নেওয়া বন্ধ রয়েছে।

এর ফলে থাইল্যান্ডে কিছু খাতে কর্মীর ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশকে পঞ্চম দেশ হিসেবে বিবেচনা করছে থাইল্যান্ড।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, থাইল্যান্ডের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নির্মাণ, কৃষি ও শিল্প খাতের মতো ‘ব্লু কলার’ কাজের পাশাপাশি দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য ‘হোয়াইট কলার’ চাকরির সুযোগও রয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ বলেন, থাইল্যান্ডের প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশে উপযুক্ত কর্মী রয়েছে। দুই দেশের সাংস্কৃতিক ও আবহাওয়াগত কিছু মিল থাকায় বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য থাইল্যান্ড একটি সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার হতে পারে।

তবে তিনি জোর দেন নিয়োগ প্রক্রিয়াটি যেন স্বচ্ছ হয় এবং বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর খরচ যেন কম রাখা যায়। একই সঙ্গে বিদেশে গিয়ে কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, থাইল্যান্ডের দক্ষ ও শ্রমশক্তির প্রয়োজন রয়েছে, আর বাংলাদেশের রয়েছে বিপুল জনশক্তি। তিনি থাই প্রতিনিধি দলকে সরকারি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড—বোয়েসেলের মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শুধু নতুন শ্রমবাজার খোলার ওপর জোর দেওয়া হয়নি; কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াটি কীভাবে হবে, সেটিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি নৈতিক ও দায়িত্বশীল শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থা চায়, যেখানে কর্মী নিয়োগের প্রাথমিক খরচ নিয়োগকর্তা বহন করবেন।

এ ছাড়া কর্মীদের জন্য স্থানীয় ভাষায় প্রমিত কর্মসংস্থান চুক্তি, ন্যায্য মজুরি, উপযুক্ত আবাসন এবং চিকিৎসা বিমার মতো সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

বাংলাদেশের অভিবাসন খাতে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নিয়োগ ব্যয় দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতিরিক্ত খরচের কারণে বিদেশে যাওয়ার পর অনেক কর্মী ঋণের চাপের মধ্যে পড়েন। ফলে নিয়োগকর্তার খরচ বহনের নীতি কার্যকর হলে কর্মীদের আর্থিক ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার বিষয়ে থাইল্যান্ডের কিছু উদ্বেগ রয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

নিতরুত্তি সুথিনন বলেন, বাংলাদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও থাইল্যান্ডে অবস্থান করা, থাইল্যান্ডকে অন্য দেশে যাওয়ার ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার এবং মানবপাচারের মতো বিষয় নিয়ে থাই কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ রয়েছে।

অর্থাৎ, দুই দেশের মধ্যে কর্মী নিয়োগের চুক্তি হলেও শুধু কর্মী পাঠানোই যথেষ্ট হবে না। কর্মীদের বৈধ অবস্থান, নিয়োগকর্তার দায়িত্ব, চুক্তির শর্ত এবং অভিবাসন আইন মেনে চলার বিষয়গুলোও চুক্তির আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে থাইল্যান্ডের এসব উদ্বেগ সমাধানের বিষয়ে কাজ করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী থাই প্রতিনিধি দলের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, থাইল্যান্ডের চিহ্নিত উদ্বেগের বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান করে দুই দেশের মধ্যে শিগগিরই একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা সম্ভব হবে।

দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৪তম বার্ষিকী উদযাপনের প্রেক্ষাপটও বৈঠকে উঠে আসে। মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও জনশক্তি বিনিময়ের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হতে পারে।

থাইল্যান্ডের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের সুযোগ তৈরি হলে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন শ্রমবাজার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে সেই সুযোগ কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে কর্মী নির্বাচনের স্বচ্ছতা, অভিবাসন ব্যয়, নিয়োগকর্তার দায়বদ্ধতা এবং বিদেশে কর্মীদের অধিকার সুরক্ষার ওপর।

বৈঠকে থাই প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ছিলেন শ্রম বিষয়ক সিনেট স্ট্যান্ডিং কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান চিনাচট সেনস্যাঙ্ক এবং শ্রম বিষয়ক ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ড. পিরাসিথ কুনলার্তারিপন। বাংলাদেশের পক্ষে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আহমাদুল হক, যুগ্মসচিব দেবজিৎ সিংহসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *