ত্যাগের আনন্দ এবং কিছু মলিন মুখের হাসির গল্প

বছরের এই একটা দিন যখন আসে, চারদিকে তখন উৎসবের ধুম পড়ে যায়। হাটে হাটে পশুর ডাক, ঘরে ঘরে নতুন পোশাকের সুবাস। অথচ এই উৎসবের আলো সবার ঘরে পৌঁছায় না। কেউ কেউ নীরবে এক কোণে বসে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। ঠিক সেইসব দীর্ঘশ্বাসকে এক চিলতে হাসিতে রূপ দিতে টাঙ্গাইলের পৌর মিলনায়তনে বসেছিল এক অদ্ভুত সুন্দর মেলবন্ধন। ২৬শে মে ২০২৬,  মঙ্গলবার, “অক্ষম ও অসহায় পুনর্বাসন সংস্থা, টাঙ্গাইল” পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে আয়োজন করেছিল এক বিশেষ অনুষ্ঠান ।

এই সুন্দর আয়োজনের পেছনে যিনি প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং প্রধান অতিথি হিসেবে পরম মমতায় দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি হলেন বিশিষ্ট সমাজসেবক আলহাজ্ব লায়ন খন্দকার নুরুল আলম (আমীন)। তিনি যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন, তখন তাঁর কণ্ঠে কোনো দম্ভ ছিল না, ছিল এক গভীর আত্মোপলব্ধি। তিনি বললেন, “ঈদুল আযহা শুধুই পশু জবাইয়ের নাম নয়, এটি ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল একটি উৎসব। হজরত ইবরাহিম (আঃ) এর ত্যাগের মহিমাকে অনুসরণ করে আমাদেরকে অসহায় ও দুস্থ মানুষদের পাশে দাঁড়াতে হবে। আজকের এই আয়োজন সেই লক্ষ্যেই করা হয়েছে। আমরা চাই আমাদের সমাজের প্রতিটি মানুষ যেন ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে। সমাজ থেকে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে হলে আমাদের সবাইকে এভাবে এক হয়ে কাজ করতে হবে।” তিনি তাঁর বক্তব্যে আরও যোগ করে বলেন, “এই নগদ অর্থ বিতরণ কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা অসহায় পরিবারগুলোর কিছুটা হলেও পাশে থাকতে পেরেছি। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যতেও এমন আয়োজন অব্যাহত থাকবে।” বক্তব্যর শেষ দিকে তিনি এই মহতী উদ্যোগের রূপকার, সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা মোঃ জাকির হোসেনকে পূর্ণ আশ্বস্ত করে বলেন, “জাকির ভাই, আপনি একা নন। এই অন্ধ, পঙ্গু আর অসহায় মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটানোর জন্য আপনি যে নিঃস্বার্থ লড়াই চালাচ্ছেন, আমি সবসময় আপনার এই ‘অক্ষম ও অসহায় পুনর্বাসন সংস্থা’র পাশে ছায়ার মতো থাকব। এই পথচলায় আমার সহযোগিতা কখনো ফুরাবে না।” তাঁর এই আশ্বাসে পুরো মিলনায়তনে এক স্বস্তির হাওয়া বয়ে যায়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করছিলেন “অক্ষম ও অসহায় পুনর্বাসন সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মোঃ জাকির হোসেন এবং পুরো অনুষ্ঠানটি এক সুতোয় বেঁধে রেখেছিলেন সঞ্চালক শফিকুল ইসলাম লেবু।

মঞ্চে একে একে কথা বলছিলেন গুণী মানুষেরা। মুখ্য আলোচক টাঙ্গাইল নাগরিক সুরক্ষা অধিকার কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার নূর মোহাম্মদ রাজ্য বলছিলেন, কীভাবে এই সামান্য একটুখানি সাহায্য একটা পরিবারের ঈদের প্রস্তুতিকে রাঙিয়ে দিতে পারে। আজকের এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়।”  “এই নগদ অর্থ বিতরণের মাধ্যমে অসহায় পরিবারগুলো তাদের ঈদের প্রস্তুতি নিতে পারবে এবং ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারবে। এটি একটি মহতী উদ্যোগ।”

বিশেষ অতিথি জেলা জজ কোর্টের এপিপি অ্যাডভোকেট মুহাঃ শাহিনুর রহমান (শাহীন) ইসলামের চিরন্তন মানবিক বাণীর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, “ইসলাম আমাদের শেখায় পরস্পরের প্রতি দায়িত্বশীল হতে। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষদের সাহায্য করবে। আজকের এই আয়োজন সেই বার্তাই বহন করে।

সমাজ সেবক মোঃ তোফাজ্জল হোসেন তাঁর বক্তব্যে বিত্তবানদের অলস বসে না থাকার তাগিদ দিয়ে বললেন, “সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষদের এগিয়ে আসা উচিত অসহায় মানুষদের জন্য। এই উদ্যোগ অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে।”

এবং ব্যবসায়ী মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন (বিপ্লব) এই উদ্যোগের সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বললেন, “এই নগদ অর্থ বিতরণ কর্মসূচি অসহায় মানুষদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আমরা সকলেই একযোগে কাজ করলে সমাজের কল্যাণ সম্ভব।”

প্রত্যেকের কথাতেই ঘুরেফিরে আসছিল একটিই সুর, আর তা হলো মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা।

সবচেয়ে সুন্দর এবং চোখ ভিজিয়ে দেওয়া দৃশ্যটি তৈরি হলো একটু পরেই। যখন প্রধান অতিথি এবং অন্য গুণীজনরা একে একে অসহায়, দুস্থ মানুষগুলোর হাতে নগদ অর্থ তুলে দিচ্ছিলেন। টাকাটা হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু সেই খামটি যখন একটা অন্ধ বা পঙ্গু মানুষের হাত স্পর্শ করছিল, তখন তাদের চোখে যে কৃতজ্ঞতার ঝিলিক দেখা যাচ্ছিল—তা কোটি টাকার চেয়ে কম নয়। “মানুষের আসল সুখ তো নিজের পকেট ভরানোতে নয়, অন্য একজনের হাত শূন্য থেকে পূর্ণ করায়।”

টাকাটা হাতে নিয়ে আশি ছুঁইছুঁই এক বৃদ্ধা তাঁর ভেজা চোখ দুটো কাপড়ের আঁচলে মুছতে মুছতে ফিসফিস করে বললেন, “কয়েকটা দিন পর ঈদ, ঘরে এক ছটাক চাল ছাড়া কিচ্ছু আছিল না। এই টাকাডা দিয়া পোলাপাইনগো লইয়া ঈদের দিনে অন্তত একটু ভালোমন্দ খাইতে পারমু। আল্লায় জাকির সাবের ভালো করুক।” আরেকজন দৃষ্টিহীন নারী টাকাটা হাতে ছোঁয়ানোর পর হাত দুটো আসমানের দিকে তুলে কেঁদে ফেলে বললেন, “চোখে তো আলো দেখি না বাবা, কিন্তু এই বিপদের দিনে যারা এই টাকাটা দিয়া সাহায্য করলো, তাদের লাইগা বুকভরা দোয়া রইলো।”

অনুষ্ঠানের শেষলগ্নে সভাপতি মোঃ জাকির হোসেন সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলছিলেন, এই ছোট ছোট মানবিক গল্পগুলোই হয়তো এই রুক্ষ পৃথিবীকে এখনো বাসযোগ্য করে রেখেছে।

মানুষগুলো যখন খামটি বুকে জড়িয়ে নিজ নিজ বাড়ির পথ ধরছিলেন, তখন তাদের হাঁটার ভঙ্গিতে একটা ভরসা ছিল। সমাজের সকলের সহযোগিতা পেলে আয়োজক “অক্ষম ও অসহায় পুনর্বাসন সংস্থা” যে তাদের এই মানবিক যাত্রা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে অব্যাহত রাখবে—এই ভরসাটুকুই আজ টাঙ্গাইলের মানুষ এখান থেকে পেয়ে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *