বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাণিজ্য বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা জরুরি হয়ে উঠেছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর রেনেসাঁ ঢাকা গুলশান হোটেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এ আলোচনা হয়। বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হি. ই. মি. ইয়ো হান-কু এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল অংশ নেন।
আলোচনার মূল বিষয় ছিল বাংলাদেশ ও কোরিয়ার মধ্যে প্রস্তাবিত কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট বা সিইপিএ (CEPA)। পাশাপাশি এলডিসি-পরবর্তী সময়ে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং সরবরাহব্যবস্থায় সহযোগিতা কীভাবে আরও বাড়ানো যায়, তা নিয়েও মতবিনিময় হয়।
বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী প্রতিনিধিরা মনে করেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। এ সময়ে বাজারে পণ্যের প্রবেশাধিকার, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে কোরীয় বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড রয়েছে। নতুন প্রেক্ষাপটে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে শুধু প্রচলিত বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও শিল্প সরবরাহব্যবস্থায় সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গোলটেবিল বৈঠকে এফআইসিসিআইয়ের বোর্ড সদস্য জাহাঙ্গীর সাদাত, জিয়াদ শাতারা, হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া ও শামস জামান এবং নির্বাহী পরিচালক টি.আই.এম. নুরুল কবির অংশ নেন।
এ ছাড়া কোরিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (কেবিসিসিআই) প্রেসিডেন্ট শাহাব উদ্দিন খান, উপদেষ্টা মোস্তফা কামাল, মহাসচিব মিলিয়ন পার্ক, পরিচালক এডওয়ার্ড কিম এবং শাহরিয়ার কামাল আলোচনায় অংশ নেন।
আলোচনায় বাংলাদেশ–কোরিয়া সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়। বিশেষ করে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশকে বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধার একটি অংশ হারানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বেশি প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। ফলে কোরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদারের সঙ্গে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত সিইপিএ শুধু দুই দেশের পণ্য বাণিজ্য বাড়ানোর একটি চুক্তি নয়; বরং বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিল্প সহযোগিতা এবং সরবরাহব্যবস্থাকে আরও গভীর করার একটি কাঠামো হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের আলোচনায় উঠে আসে, পারস্পরিক স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লক্ষ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ও কোরিয়ার মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে এলডিসি-পরবর্তী অর্থনীতিতে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।