‘সবুজের বৈভব’: প্রকৃতিকে নতুন করে দেখার শিল্প

‘সবুজের বৈভব’ প্রদর্শনীতে সুবর্ণ চক্রবর্তী তন্ময়ের জলরঙে আঁকা ঘন সবুজ পাতা ও উদ্ভিদের চিত্র

সবুজ আমাদের খুব পরিচিত একটি রং। এতটাই পরিচিত যে, অনেক সময় আমরা তাকে দেখিই না। গাছ দেখি। বন দেখি। মাঠ দেখি। রাস্তার পাশে জন্মানো লতা দেখি। কিন্তু পাতা দেখি না। পাতার শিরা দেখি না। আলো বদলালে একই পাতার রং কীভাবে বদলে যায়, তা লক্ষ করি না। ঘাসের মধ্যে কোনটি অন্যটির ওপর ঝুঁকে আছে, কোন লতা কোন গাছকে জড়িয়ে উঠছে, কিংবা পাতার আড়ালে একটি ছোট ফুল কীভাবে প্রায় অদৃশ্য হয়ে আছে—এসব আমাদের দেখার অভ্যাসের অংশ নয়।

সুবর্ণ চক্রবর্তী তন্ময়ের ‘সবুজের বৈভব’ এই না-দেখার জায়গাটিতেই আঘাত করে।

ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে ২২ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা এই একক প্রদর্শনীতে তন্ময় প্রকৃতিকে বড় কোনো দৃশ্য হিসেবে হাজির করেননি। তাঁর ছবিতে নেই পাহাড়ের মহিমা, নদীর বিস্তার কিংবা সূর্যাস্তের নাটকীয়তা। বরং আছে পাতা, ঘাস, লতা, ছোট ফুল এবং উদ্ভিদের এমন কিছু উপস্থিতি, যেগুলো সাধারণত আমাদের চোখের পাশ দিয়ে চলে যায়। এখানেই প্রদর্শনীটির গুরুত্ব।তন্ময় প্রকৃতির ছবি আঁকছেন না শুধু। তিনি আসলে দেখার একটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন।

প্রদর্শনীর অধিকাংশ ছবির কেন্দ্রে রয়েছে পাতা। কিন্তু ‘কেন্দ্র’ শব্দটিও এখানে খানিক বিভ্রান্তিকর। কারণ তাঁর ছবিতে নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্র নেই। একটি পাতা অন্য একটি পাতাকে আড়াল করছে। তার পাশ দিয়ে আরেকটি পাতা উঠে এসেছে। কোথাও আলো এসে পড়েছে। কোথাও গাঢ় ছায়া। কোথাও পাতার শরীর স্পষ্ট। কোথাও তা প্রায় মিলিয়ে গেছে আশপাশের সবুজের সঙ্গে। এই বিন্যাসে দর্শকের চোখ কোনো একটি জায়গায় স্থির হতে পারে না।

প্রকৃতিতে তাকালে আমরা সাধারণত কোনো দৃশ্যের একটি নির্দিষ্ট অংশকে আলাদা করে দেখি। একটি গাছ, একটি ফুল কিংবা একটি দৃশ্য আমাদের দৃষ্টি আটকে নেয়। তন্ময়ের ছবিতে সেই স্বাভাবিক অভ্যাসটি ভেঙে যায়। চোখকে ছবির ভেতর ঘুরতে হয়।

মালাবার পালং, মিকানিয়া মাইক্রান্থা কিংবা হায়সিন্থ বিনের মতো উদ্ভিদ এখানে কেবল উদ্ভিদতাত্ত্বিক পরিচয়ের বিষয় নয়। তারা ছবির দৃশ্যমান চরিত্র। যে উদ্ভিদকে হয়তো রাস্তার পাশে দেখে আমরা চিনতে পারিনি, শিল্পীর কাছে সেটিই দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। শিল্পী প্রকৃতিকে সুন্দর করে দেখানোর চেষ্টা করছেন না। তিনি আমাদের পরিচিত প্রকৃতির দিকে একটু বেশি সময় তাকাতে বাধ্য করছেন।

প্রদর্শনীর আরেকটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো ফুলের ব্যবহার। পিঙ্ক সররেল, কুইন্স ফ্লাওয়ার, ইয়েলো বেলস কিংবা চায়না অ্যাস্টারের মতো ফুল তাঁর ছবিতে আছে। কিন্তু ফুল কখনো ছবির একমাত্র আকর্ষণ হয়ে ওঠে না। বরং ঘন পাতার ভেতর থেকে কখনো তারা দেখা দেয়, কখনো আবার প্রায় হারিয়ে যায়। এটি প্রচলিত ফুলের ছবির বিপরীত।

ফুলকে সাধারণত সৌন্দর্যের কেন্দ্র হিসেবে দেখানো হয়। তন্ময় সেই কেন্দ্রটিকে সরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর ছবিতে ফুলকে খুঁজে নিতে হয়।এই খুঁজে নেওয়ার অভিজ্ঞতাটিই সম্ভবত প্রদর্শনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ আমরা যা সহজে দেখতে পাই, সেটা থেকে আমাদের মনোযোগও সহজে চলে যায়। আর যা একটু আড়ালে থাকে, তার জন্য আমাদের থামতে হয়। তন্ময়ের ছবির ফুলগুলো সেই থামার কারণ তৈরি করে।

‘সবুজের বৈভব’ নামটি প্রথমে একরৈখিক মনে হতে পারে। কিন্তু ছবিগুলোর সামনে দাঁড়ালে বোঝা যায়, শিল্পীর কাছে সবুজ কোনো একক রং নয়। কোথাও সবুজের মধ্যে হলুদের আভা। কোথাও নীলের উপস্থিতি। কোথাও ধূসরতা। কোথাও আলোয় তা প্রায় স্বচ্ছ। আবার কোথাও ছায়ার কারণে সবুজ এত গভীর হয়ে উঠেছে যে তার ভেতরের স্তরগুলো আলাদা করা কঠিন।

জলরং দিয়ে আঁকা খুব কঠিন কাজ। কারণ এতে একদিকে যেমন হাতের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ লাগে, অন্যদিকে পানি কোন দিকে গড়িয়ে যাবে তা সম্পূর্ণ আটকানো যায় না। সুবর্ণ চক্রবর্তী তন্ময় এই জলরঙের আসল বৈশিষ্ট্য বা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্বভাবকেই খুব সততার সাথে ব্যবহার করেছেন।

তিনি পাতলা রঙের ওপর আরেকটা রঙের পাতলা পোচ (লেয়ার) বসিয়েছেন। এতে আলো-ছায়া আর পাতার ওপর অন্য পাতার ছায়া এমনভাবে ফুটে উঠেছে যে আসল প্রকৃতির মতো অনুভুতি তৈরি হয়। স্যাপ গ্রিন, গ্যামবোজ হিউ, ফ্রেঞ্চ আল্ট্রামারিন—এগুলো বিভিন্ন রঙের টেকনিক্যাল নাম, যেগুলো মিশিয়ে তিনি সবুজ রঙের নানা শেড তৈরি করেছেন।

ছোট ছোট ফ্রেমের ছবিগুলো দেখলে মনে হয় যেন অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে কোনো উদ্ভিদের ভেতরের সূক্ষ্ম গঠন দেখা যাচ্ছে। আর লম্বা বা বড় ফ্রেমের ছবিগুলো দেখলে মনে হয় দর্শক নিজেই যেন কোনো ঘন সবুজের ভেতরে ঢুকে পড়েছেন।

এই কাজগুলোর পেছনে করোনাকালের অভিজ্ঞতার কথাও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যখন ঘরে আটকে ছিল, তখন প্রকৃতির চলাচল থেমে থাকেনি। রাস্তার ধারে আগাছা বেড়েছে। লতা ছড়িয়েছে। গাছের পাতা বদলেছে। ফুল ফুটেছে। মানুষের গতি থেমে গেলেও প্রকৃতির পরিবর্তন থামেনি।

তন্ময়ের শিল্পচর্চায় সেই সময়ের অভিজ্ঞতা দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে রূপ নিয়েছে। এখানে মহামারিকে সরাসরি কোনো দৃশ্যের মাধ্যমে দেখানো হয়নি। নেই আতঙ্ক, নেই মৃত্যুর ছবি, নেই মানুষের বিচ্ছিন্নতার সরাসরি বয়ান। বরং মানুষের অনুপস্থিতির সময়ে প্রকৃতিকে দেখার একটি অভিজ্ঞতা ছবিগুলোর ভেতরে থেকে গেছে।

পরিবেশ নিয়ে শিল্পের একটি প্রচলিত প্রবণতা হলো বিপর্যয় দেখানো। বন উজাড়, নদী দূষণ, প্রাণীর বিলুপ্তি কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট সামনে এনে দর্শকের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করা।

তন্ময়ের পথটি আলাদা। তিনি বিপর্যয় দেখান না। বরং দেখান সেই প্রকৃতিকে, যাকে হারানোর আগে আমরা হয়তো ঠিকমতো দেখিইনি।এখানে পরিবেশ-সচেতনতার একটি নীরব ধরন কাজ করে।

একটি পাতাকে দীর্ঘ সময় দেখা এবং একটি বন হারিয়ে যাওয়ার খবর পড়া এক অভিজ্ঞতা নয়। কিন্তু প্রথম অভিজ্ঞতাটি দ্বিতীয়টির জন্য একটি মানসিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে। যে জিনিসকে আমরা মন দিয়ে দেখেছি, তার অনুপস্থিতি হয়তো একদিন আমাদের কাছে বেশি অর্থ বহন করবে। এই জায়গাতেই ‘সবুজের বৈভব’কে পরিবেশভিত্তিক শিল্পের একটি সংযত অনুশীলন হিসেবে পড়া যায়।

তন্ময়ের ছবিগুলোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো কোনো প্রচলিত গল্প বলে না। এখানে চরিত্র নেই। ঘটনা নেই। শুরু বা শেষ নেই। কিন্তু তাই বলে বয়ান নেই—এমন নয়। বয়ানটি তৈরি হয়েছে পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে।

একই ধরনের পাতা বারবার ফিরে আসে। সবুজ ফিরে আসে। ঘনত্ব ফিরে আসে। আড়াল ফিরে আসে। আবার কোনো কোনো ছবিতে সেই ঘনত্বের ভেতর ছোট একটি ফুল এসে চোখ থামিয়ে দেয়।

অর্ধশতাধিক কাজ একসঙ্গে দেখলে এই পুনরাবৃত্তি কখনো শক্তি, কখনো দুর্বলতা হয়ে ওঠে।

একদিকে এটি শিল্পীর অনুসন্ধানের গভীরতা বোঝায়। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের দৃশ্যমান ভাষা দর্শকের জন্য ক্লান্তিকর হয়ে উঠতে পারে। এখানেই প্রদর্শনীটির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

একটি প্রদর্শনী যদি দর্শককে বারবার একই ধরনের দৃশ্যের সামনে দাঁড় করায়, তাহলে কি সেটি একঘেয়ে? নাকি শিল্পী ইচ্ছাকৃতভাবেই দর্শকের দ্রুত দেখার অভ্যাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন? তন্ময়ের কাজের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না।

আমরা দ্রুত ছবি দেখি। দ্রুত পরের ছবিতে চলে যাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্দায় একটি ছবি কয়েক সেকেন্ডের বেশি আমাদের ধরে রাখে না। তন্ময়ের ছবিগুলো সেই গতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে চায় না।

তাই প্রদর্শনীটি দেখতে গিয়ে অস্থির দর্শকের কাছে যে একঘেয়েমি তৈরি হতে পারে, সেটিই হয়ে উঠতে পারে এক ধরনের অনুশীলন।তবু কিউরেশনের জায়গায় আরও বৈচিত্র্য থাকলে এই অভিজ্ঞতা আরও শক্তিশালী হতে পারত। শিল্পীর প্রাথমিক আঁকাগুলো কিংবা পর্যবেক্ষণের নোট পাশাপাশি রাখা হলে ছবির পেছনের দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি দর্শকের সামনে আরও পরিষ্কার হয়ে উঠত।

তন্ময়ের বয়স মাত্র ২৫ বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। ২০২১ সালে ২৬তম বার্জার তরুণ চিত্রশিল্পী প্রতিযোগিতায় তিনি শ্রেষ্ঠ পুরস্কার অর্জন করেন। ২০২৩ সালে জলরং বিভাগে মাধ্যমসেরা পুরস্কারও পান।

তবে ‘সবুজের বৈভব’-কে এসব পুরস্কারের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখলে প্রদর্শনীর আসল জায়গাটি ধরা পড়বে না। কারণ এই প্রদর্শনীর শক্তি পুরস্কারে নয়। এর শক্তি ধৈর্যে। একজন তরুণ শিল্পী কেন এমন একটি বিষয় নিয়ে এত দীর্ঘ সময় কাজ করবেন, যার মধ্যে নাটকীয়তা কম? কারণ সম্ভবত তন্ময়ের আগ্রহ দৃশ্যের চমকে নয়। তাঁর আগ্রহ পর্যবেক্ষণে।

এটি তাঁর শিল্পভাষার একটি সম্ভাবনাও তৈরি করে। তিনি যদি ভবিষ্যতে এই পর্যবেক্ষণকে আরও বিস্তৃত করতে পারেন, উদ্ভিদকে ঘিরে তাঁর এই অনুসন্ধান আরও নানা দিকে যেতে পারে।

‘সবুজের বৈভব’ শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির প্রদর্শনী নয়। এটি চোখের প্রদর্শনী। কী দেখছি, কতক্ষণ দেখছি এবং কোন জিনিসকে দেখার যোগ্য বলে মনে করছি—এই তিনটি প্রশ্ন প্রদর্শনীর ভেতরে নীরবে কাজ করে।

একটি পাতা এখানে কেবল পাতা নয়। কারণ তাকে এত সময় ধরে দেখার সুযোগ সচরাচর আমরা নিই না। একটি লতা এখানে কেবল লতা নয়। কারণ তার জটিলতার দিকে তাকালে বোঝা যায়, পরিচিত মানেই সরল নয়। একটি ছোট ফুলও এখানে শুধু ফুল নয়। কারণ তাকে দেখতে হলে পাতার ভিড়ের মধ্যে চোখকে একটু থামাতে হয়।

সুমন ওয়াহিদের ভাষায়, এই প্রদর্শনী শেষ পর্যন্ত ‘মনোযোগের নৈতিকতা’র দিকে নিয়ে যায়। কথাটি যথার্থ। আজকের দ্রুতগতির দৃশ্যমান জগতে মনোযোগ নিজেই একটি দুর্লভ সম্পদ। তন্ময়ের ছবিগুলো সেই সম্পদ ফিরিয়ে আনার কোনো বড় ঘোষণা দেয় না। বরং খুব নীরবে বলে—একটু থামুন। আরেকটু দেখুন। হয়তো সেই দেখার মধ্যেই যত্নের শুরু।

‘সবুজের বৈভব’ আমাদের চোখকে এমন কিছু দেখতে শেখায়, যা এতদিন চোখের সামনেই ছিল। প্রকৃতির প্রতি যত্ন শুরু হওয়ার আগে  তাকে দেখা দরকার। আর সত্যিকারের দেখা শুরু হয়, যখন আমরা তাড়াহুড়ো করা বন্ধ করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *