পীরগঞ্জে ছয় দশক পর লৌহখনির অনুসন্ধান, এখনো মিলেনি বাণিজ্যিক উত্তোলনের নিশ্চয়তা

পীরগঞ্জে ভূগর্ভস্থ খনিজ অনুসন্ধানের জন্য জিডিএইচ-৭৯/২০২৫ কূপ খননের দৃশ্য

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ভেলামারি পাথারে প্রায় ছয় দশক পর আবারও লৌহ আকরিকসহ ধাতব খনিজের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির বিপরীতে এখনো খনি থেকে লোহা উত্তোলন শুরু হয়নি। বর্তমানে চলছে অনুসন্ধান ও ভূগর্ভের নমুনা সংগ্রহের কাজ। খনিতে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন সম্ভব কি না, তা অনুসন্ধানের ফল ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পরই নির্ধারণ করা হবে।

পীরগঞ্জ উপজেলার শানেরহাট ও মিঠিপুর ইউনিয়নের মধ্যবর্তী ভেলামারি পাথার এলাকায় এই খনিজ সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৬৫ সালে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা প্রায় ছয় বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রাথমিক অনুসন্ধান চালান। সে সময় চারটি অনুসন্ধান কূপ খনন করে সেগুলোর মুখ কংক্রিট দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর কিছু চিহ্ন এখনো এলাকায় রয়েছে।

স্বাধীনতার পরও এলাকাটিতে বিভিন্ন সময়ে অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০০ সালে জিডিএইচ-৫৪ নামের একটি কূপ খনন করা হয়েছিল। ২০২৩ সালে মিঠিপুর ইউনিয়নের কাশিমপুর এলাকায় জিডিএইচ-৭৮/২৩ কূপেও ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদের উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

সর্বশেষ অনুসন্ধান কার্যক্রমে জিডিএইচ-৭৯/২০২৫ নামে নতুন কূপ খনন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের নথিতেও এই কর্মসূচির উল্লেখ রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কূপটি এক হাজার ২০০ মিটার গভীর পর্যন্ত নেওয়া হবে।

ভূতাত্ত্বিকদের ধারণা, এই অঞ্চলের ভূগর্ভে লোহার পাশাপাশি তামা, নিকেল ও ম্যাঙ্গানিজের মতো ধাতব খনিজ থাকতে পারে। এমনকি স্বর্ণের উপস্থিতির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। তবে কোন খনিজ কত পরিমাণে রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও বলেছেন, অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগে খনিজের প্রকৃতি ও মজুতের পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। পর্যাপ্ত মজুত এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনকভাবে উত্তোলনের সুযোগ পাওয়া গেলে তবেই বাণিজ্যিক খননের সুপারিশ করা হবে। অর্থাৎ পীরগঞ্জকে এখনই একটি উৎপাদনশীল লৌহখনি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এটি এখনো সম্ভাবনাময় একটি খনিজ অঞ্চল।

পীরগঞ্জের খনি ছয় দশক ধরে বন্ধ থাকার পেছনে লোহা আমদানিকারকদের কোনো চক্র বা কমিশন বাণিজ্যের ভূমিকা ছিল—এমন দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। বরং বিভিন্ন প্রতিবেদনে খনি উন্নয়ন না হওয়ার কারণ হিসেবে দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অনুসন্ধানের সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্তের অভাবের কথা উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক বদরুদ্দোজা মিয়াও বলেছিলেন, তখনো খনন পর্যায়ে যাওয়ার মতো যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশের শিল্প খাতে লোহা ও ইস্পাতের চাহিদা অনেক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোহা, ইস্পাত ও অন্যান্য মৌল ধাতু আমদানিতে কয়েক শ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। তবে পীরগঞ্জের সম্ভাব্য খনি থেকে বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে—এমন নির্দিষ্ট হিসাবের সমর্থনে নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

একইভাবে এই খনি চালু হলে দেশের নির্মাণসামগ্রীর দাম অর্ধেকে নেমে আসবে বা আগামী ৩০ বছর দেশের পুরো লোহার চাহিদা এখান থেকে মেটানো যাবে—এমন দাবিও এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এসব হিসাবের জন্য প্রথমে মজুতের পরিমাণ, আকরিকের গুণমান, উত্তোলন ব্যয়, প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় এবং বাজারদর সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।

খনির অবস্থান কৃষিপ্রধান এলাকায় হওয়ায় ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নিলে পরিবেশ ও কৃষিজমির ওপর প্রভাব অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে খনন করলে ওপরের জমির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, ভূমির স্থিতিশীলতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষিজমির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব—সবই পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষার বিষয়।

পীরগঞ্জে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো অনুসন্ধান শেষ করা। এক হাজার ২০০ মিটার গভীর কূপ থেকে পাওয়া নমুনা পরীক্ষা করে খনিজের প্রকৃতি ও ঘনত্ব নির্ধারণ করতে হবে। এরপর মজুতের পরিমাণ এবং উত্তোলনের সম্ভাব্য ব্যয় নিরূপণ করতে হবে।

খনিজের মজুত পর্যাপ্ত হলে এবং উত্তোলন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক প্রমাণিত হলে বাণিজ্যিক খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে কৃষিজমি, পানি, পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও মূল্যায়ন করতে হবে।

ছয় দশক পর পীরগঞ্জে অনুসন্ধান পুনরায় শুরু হওয়া নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু অনুসন্ধানের শুরু এবং খনি আবিষ্কার এক বিষয় নয়; আর খনিজের উপস্থিতি প্রমাণিত হওয়া ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক খনি হওয়াও এক বিষয় নয়। পীরগঞ্জের প্রকৃত সম্ভাবনা নির্ধারণ করবে ভূতাত্ত্বিক তথ্য, পরীক্ষাগারের ফল এবং অর্থনৈতিক সমীক্ষা—আশাবাদী প্রচার নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *