একবিংশ শতাব্দীর সেরা ১০০ টিভি ধারাবাহিকের তালিকা প্রকাশ নিউ ইয়র্ক টাইমসের

কেবল টেলিভিশন থেকে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে টেলিভিশনের পরিবর্তনের প্রতীকী চিত্র

আমজাদ সুমন

একবিংশ শতাব্দীর টেলিভিশন নাটকের পরিবর্তনকে তুলে ধরে সেরা ১০০ ধারাবাহিকের তালিকা প্রকাশ করেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। তালিকায় কেবল জনপ্রিয়তা বা দর্শকসংখ্যাকে বিবেচনা করা হয়নি। গল্প বলার অভিনবত্ব, চরিত্রের গভীরতা, নির্মাণশৈলী এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের সমালোচক ও সংস্কৃতিবিষয়ক সাংবাদিকদের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি এই তালিকায় গত ২৫ বছরের টেলিভিশন নির্মাণের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলো উঠে এসেছে। কেবল টেলিভিশনের প্রভাবশালী যুগ থেকে শুরু করে অনলাইন সম্প্রচারনির্ভর বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন ধারার উল্লেখযোগ্য নির্মাণ এতে স্থান পেয়েছে।

একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ‘দ্য সোপ্রানোস’ ও ‘দ্য ওয়্যার’ টেলিভিশন নাটকের গল্প বলার ধরনে বড় পরিবর্তন আনে। এর পর ‘ব্রেকিং ব্যাড’ ও ‘ম্যাড মেন’ চরিত্রনির্ভর ও দীর্ঘমেয়াদি গল্প বলার জনপ্রিয়তা আরও বাড়ায়। পরবর্তী সময়ে ‘সাকসেশন’, ‘ফ্লিব্যাগ’ এবং ‘দ্য বিয়ার’-এর মতো ধারাবাহিক নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে সমাদৃত হয়।

‘সাকসেশন’-এ একটি ধনী পরিবারের উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার লড়াই এবং পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েনকে ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়েছে। ‘ফ্লিব্যাগ’-এ ব্যক্তিগত সম্পর্ক, একাকিত্ব, অপরাধবোধ ও আত্মপরিচয়ের মতো বিষয়কে সংক্ষিপ্ত পরিসরে গভীরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তালিকার মধ্য দিয়ে টেলিভিশন নির্মাণে সম্প্রচারভিত্তিক মাধ্যম থেকে অনলাইনভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের চিত্রও স্পষ্ট হয়েছে। নেটফ্লিক্স, এইচবিও, অ্যামাজন প্রাইম ও অ্যাপল টিভির মতো প্রতিষ্ঠান দর্শকদের অনুষ্ঠান দেখার অভ্যাস বদলে দিয়েছে। একই সঙ্গে নির্মাতাদেরও দীর্ঘ ও জটিল গল্প বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রচলিত টেলিভিশনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একটি পর্ব শেষ করার চাপ ছিল। বিজ্ঞাপনের বিরতিও গল্পের কাঠামোকে প্রভাবিত করত। অনলাইন সম্প্রচার সেই সীমাবদ্ধতার অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। ফলে নির্মাতারা একটি গল্পকে একাধিক পর্ব ও মৌসুমে বিস্তৃত করার পাশাপাশি দৃশ্য ও চরিত্র নির্মাণে বেশি স্বাধীনতা পেয়েছেন।

দর্শকদের দেখার অভ্যাসেও এসেছে পরিবর্তন। আগে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে একটি পর্বের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রে একটি মৌসুমের একাধিক পর্ব একসঙ্গে দেখা যায়। এতে ধারাবাহিকের গল্পের সঙ্গে দর্শকের সম্পৃক্ততার ধরনও বদলেছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের তালিকায় বিভিন্ন দেশের ও বিভিন্ন ভাষার নির্মাণের উপস্থিতিও টেলিভিশনের বৈশ্বিক বিস্তারের দিকটি তুলে ধরে। দক্ষিণ কোরিয়ার ‘স্কুইড গেম’-এর মতো ধারাবাহিক দেখিয়েছে, স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে তৈরি গল্পও বিশ্বজুড়ে দর্শক পেতে পারে।

তবে তালিকাটিকে টেলিভিশনের চূড়ান্ত বা সর্বসম্মত শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নিউ ইয়র্ক টাইমসের সমালোচক ও সংশ্লিষ্ট লেখকদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে তৈরি একটি নির্বাচিত তালিকা। ফলে অন্য সমালোচক, দর্শক বা দেশের দর্শকদের কাছে পছন্দের ধারাবাহিকের তালিকা ভিন্ন হতে পারে।

তারপরও একবিংশ শতাব্দীর টেলিভিশনের গতিপথ বোঝার ক্ষেত্রে তালিকাটি গুরুত্বপূর্ণ। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট—টেলিভিশন এখন আর শুধু নির্দিষ্ট সময়ে প্রচারিত বিনোদন অনুষ্ঠান নয়। এটি জটিল চরিত্র, দীর্ঘ গল্প, সামাজিক বাস্তবতা এবং সমকালীন মানুষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার একটি শক্তিশালী শিল্পমাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

 

আরও পড়ুন: ভেনিসে ইতিহাস গড়ল ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *