পরিবেশ, প্রাণী ও জনস্বাস্থ্যকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই: আবদুল আউয়াল মিন্টু

রোমে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বৈশ্বিক সম্মেলনে বক্তব্য দিচ্ছেন পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।

রোমে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বৈশ্বিক সম্মেলনে পরিবেশ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও জনস্বাস্থ্যকে সমন্বিতভাবে বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।

তিনি বলেছেন, পরিবেশ, প্রাণী ও জনস্বাস্থ্যকে পৃথক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও বাস্তুতন্ত্র পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একটি ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত অন্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ে।

সোমবার (২১শে সেপ্টেম্বর) ইতালির রাজধানী রোমে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সদর দপ্তরে শুরু হওয়া কৃষিখাদ্য ব্যবস্থায় ‘এক স্বাস্থ্য’ কার্যক্রমবিষয়ক বৈশ্বিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনটি ২১ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, কৃষিখাদ্য ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা নির্ভর করে মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও বাস্তুতন্ত্রের সম্মিলিত সুস্থতার ওপর। তাই কোনো একটি খাতকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করে কার্যকর সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ ও নিম্নভূমির গঙ্গা বদ্বীপে অবস্থিত বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। একই ভূদৃশ্যে মানুষ, বাস্তুতন্ত্র ও কৃষিখাদ্য ব্যবস্থা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে একটি খাতে তৈরি হওয়া সংকট দ্রুত অন্য খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশ ‘এক স্বাস্থ্য’ ধারণাকে শুধু একটি নীতি বা ধারণা হিসেবে নয়, বরং বাস্তব শাসনব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অংশীদারত্ব ও সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়, তথ্য বিনিময় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ‘এক স্বাস্থ্য’ কাঠামোয় পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রকে কেন্দ্রীয়ভাবে যুক্ত করতে হবে। জেলা ও প্রান্তিক পর্যায়েও সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয় নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দরকার। বাংলাদেশের জাতীয় ‘এক স্বাস্থ্য’ কাঠামোয় পরিবেশ খাতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এখন যৌথ পরিকল্পনা ও সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে এই অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

মন্ত্রীর মতে, প্রস্তাবিত ‘এক স্বাস্থ্য’ তথ্যকেন্দ্র বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর মাধ্যমে নীতি নির্ধারণ, পরিকল্পনা ও বাস্তব কার্যক্রমে তথ্য ও অভিজ্ঞতা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

সম্মেলনটির আলোচনায় কৃষি, পরিবেশ, স্বাস্থ্য, অর্থ ও নগর ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, নতুন রোগের বিস্তার, জীবাণুনাশক ওষুধের কার্যকারিতা কমে যাওয়া, খাদ্যনিরাপত্তা এবং পরিবেশগত অবক্ষয়কে পরস্পর সম্পর্কিত ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সম্মেলনের আয়োজক জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা জানিয়েছে, মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্য পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কৃষিখাদ্য ব্যবস্থায় ‘এক স্বাস্থ্য’ পদ্ধতির ব্যবহারিক প্রয়োগ বাড়ানোই সম্মেলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আলোচনায় জ্ঞান বিনিময়, ঝুঁকি প্রতিরোধ, নজরদারি, টেকসই সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগের সুযোগ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

কৃষিখাদ্য ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যকর উৎপাদনব্যবস্থা, মাটি, পানি, উদ্ভিদ, প্রাণী, বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও সম্মেলনে আলোচনা হচ্ছে। তিন দিনের আয়োজনে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, বিশেষজ্ঞ, কৃষক, বিজ্ঞানী এবং অন্যান্য অংশীজন অংশ নিচ্ছেন।

আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, আগামী নভেম্বরে তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠেয় কপ৩১-এর আগে রোমের এই সম্মেলন বিশেষভাবে সময়োপযোগী। সম্মেলনের অভিজ্ঞতা কপ৩১-এর আলোচনায় তুলে ধরার পাশাপাশি জলবায়ু ও পরিবেশগত স্বাস্থ্য নিয়ে আরও সমন্বিত বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে বাংলাদেশ কাজ করবে।

তিনি বাংলাদেশের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জের অভিজ্ঞতা অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বিনিময়ের পাশাপাশি তাদের অভিজ্ঞতা থেকেও শেখার প্রস্তুতির কথা জানান। তাঁর মতে, সম্মেলনের আলোচনা শুধু নীতিগত অঙ্গীকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব কর্মসূচি, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এবং স্থানীয় পর্যায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে রূপ দিতে হবে।

উদ্বোধনী অধিবেশনে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মহাপরিচালক ছু তুংইউ, সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট গাই পারমেলাঁ, তানজানিয়ার প্রধানমন্ত্রী মুইগুলু লামেক নচেম্বা এবং সার্বিয়ার প্রধানমন্ত্রী জুরো মাত্সুতসহ বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও তিউনিসিয়াসহ বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরাও সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।

সম্মেলনটি ২৩শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। শেষ পর্যায়ে কৃষিখাদ্য ব্যবস্থায় ‘এক স্বাস্থ্য’ কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন অংশীজনের অংশীদারত্ব, বিনিয়োগ ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *