ঢাকা: প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬ নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে দাবি করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন, সাংবাদিক, আইনজীবী ও অধিকারকর্মীরা।
শনিবার সকাল ১১টায় রাজধানীর তোপখানা রোডে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। বৈঠকের বিষয় ছিল ‘প্রস্তাবিত সাইবার আইন : জবান বন্ধের নয়া বন্দোবস্ত’।
বৈঠকের শুরুতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক, গবেষক ও আইনজীবী রোকন রকি। পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক, আইনজীবী ও অধিকারকর্মীরা আলোচনায় অংশ নেন।
গীতিকবি ও অধিকারকর্মী শহীদুল্লাহ ফরায়জী বলেন, ‘এটা সাইবার সুরক্ষা আইন হচ্ছে না। এটা তারা সরকার সুরক্ষা আইন বানাচ্ছেন।’
ডিএসএ ভুক্তভোগী নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক গোলাম মাহফুজ জোয়ার্দার বলেন, কোনো আলোচনা ছাড়াই সাইবার পুলিশ তৈরি করা হয়েছে। সরকার নাগরিকের ওপর জুলুমের সব বন্দোবস্ত আরও পোক্ত করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, সরকার জনগণের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে দল-মত নির্বিশেষে আবারও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন প্রয়োজন হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুবী আমাতুল্লাহ বলেন, জনগণের কাছে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকার প্রবণতা সরকারের মধ্যে দেখা যায়। এর পরিণতি কখনো ভালো হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, সরকার বারবার সংবিধানের কথা বলে। কিন্তু তারাই সংবিধান মানে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকের সরকারের সমালোচনার অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
সভাপতির বক্তব্যে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে বিভিন্ন আপত্তি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার নামে ভিন্নমত দমনের প্রবণতা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনে দেখা গেছে। প্রস্তাবিত সংশোধনী সেই ধারারই নতুন রূপ।
গণঅভ্যুত্থানের পর নিপীড়নমূলক আইনি কাঠামো পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর দাবি, প্রস্তাবিত সংশোধনী সেই প্রত্যাশার সম্পূর্ণ বিপরীত।
হাসনাত কাইয়ূম বলেন, ‘আশঙ্কা’ থেকে ‘বিশ্বাসে’র ভিত্তিতে বিষয়বস্তু বন্ধ বা অপসারণের ক্ষমতা মন্ত্রণালয় ও সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত যেকোনো সংস্থাকে দেওয়া হচ্ছে। এতে আদালতের আদেশ ও প্রমাণ ছাড়াই মতপ্রকাশ মুছে ফেলার সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, স্পষ্ট সংজ্ঞা ছাড়া অপরাধ নির্ধারণ করা হলে রাজনৈতিক স্বার্থে আইনের অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। আগের আইনগুলোতেও অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্বার্থ প্রাধান্য পাওয়ার সুযোগ ছিল বলে দাবি করেন তিনি। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সেই সুযোগ আরও প্রকট হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপির প্রসঙ্গ তুলে হাসনাত কাইয়ূম বলেন, তাঁদের দলটিকে এখনো গণঅভ্যুত্থানের শক্তি এবং আন্দোলনের সহযাত্রী হিসেবে মনে করতে চান। তবে এই আইনের মাধ্যমে বিএনপি ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনার পথে’ এগিয়ে যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বিএনপিকে গণঅভ্যুত্থানের সময়কার ঐক্যের কথা স্মরণ করার আহ্বান জানান। তাঁর ভাষায়, আন্দোলনের সময় একজন ছাত্রদল কর্মী বলেছিলেন, ‘কেউ কাউরে ছাইড়া যাইয়েন না’। একইভাবে বিএনপিকে গণঅভ্যুত্থানের চেতনা থেকে সরে না যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
হাসনাত কাইয়ূম বলেন, বিএনপি এই আহ্বানে সাড়া না দিলে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক দিতে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন বাধ্য হবে।
বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)র স্থায়ী কমিটির সদস্য কে এম জাবির, জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ, নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের সংগঠক বাকী বিল্লাহ, গ্রীন পার্টির মহাসচিব ইউসুফ আম্মার, অহিংস গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক জালাল আহমেদ, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সহসভাপতি এ জেড নিজাম উদ্দিন ঠাকুর, ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক জহিরুল ইসলাম কাজল এবং নারী বিষয়ক সহসম্পাদিকা মনোয়ারা রহমান।
বৈঠক সঞ্চালনা করেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া।