বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাবশালী শ্রেণির চরিত্র বদলে যাচ্ছে। একসময় সুইজারল্যান্ডের ডেভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলন ঘিরে থাকা কর্পোরেট নির্বাহী, ব্যাংকার ও রাজনীতিকদের আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ক্ষমতাবান শ্রেণির প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। এখন সেই জায়গায় উঠে আসছে গণিত, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অসাধারণ দক্ষ এক নতুন প্রজন্ম।
দ্য ইকোনমিস্ট-এর ব্যবসা-বিষয়ক বিশ্লেষণে এই নতুন শ্রেণিকে বলা হয়েছে ‘অলিম্পিয়াড ম্যান’। ১৬ই সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও কম্পিউটার বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের মতো প্রতিযোগিতায় সাফল্য পাওয়া তরুণ মেধাবীদের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, কোয়ান্ট ব্যবসা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করছেন।
এটি শুধু কিছু প্রতিভাবান মানুষের সাফল্যের গল্প নয়; বরং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে ক্ষমতা ও সম্পদ তৈরির পদ্ধতিতে পরিবর্তনের একটি দিকও এতে প্রতিফলিত হচ্ছে।
‘ডেভোস ম্যান’ বলতে মূলত সেই আন্তর্জাতিক অভিজাত শ্রেণিকে বোঝানো হতো, যাদের প্রভাবের বড় অংশ তৈরি হয়েছিল ব্যবসা, রাজনীতি, কূটনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন ছিল এই নেটওয়ার্কের অন্যতম দৃশ্যমান মঞ্চ। সেখানে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, কর্পোরেট নির্বাহী, ব্যাংকার ও নীতিনির্ধারকেরা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতেন।
অন্যদিকে ‘অলিম্পিয়াড ম্যান’-এর শক্তির উৎস ভিন্ন। এখানে সামাজিক যোগাযোগ, অভিজাত প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ বা দীর্ঘ কর্পোরেট অভিজ্ঞতার চেয়ে গণিত, অ্যালগরিদম, প্রোগ্রামিং ও প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড শুরু হয় ১৯৫৯ সালে। পরবর্তী সময়ে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের মতো ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডভিত্তিক প্রতিযোগিতা গড়ে ওঠে।
এসব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, বিশ্লেষণী দক্ষতা এবং বিমূর্ত চিন্তার সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। ফলে পদকজয়ীরা শুধু একটি প্রতিযোগিতার সাফল্য অর্জন করেন না; প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে তাঁদের দক্ষতার একটি দৃশ্যমান প্রমাণও তৈরি হয়।
দ্য ইকোনমিস্ট এই প্রবণতাকে প্লেটোর রিপাবলিক-এ বর্ণিত মানুষের স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ শ্রেণিবিন্যাসের ধারণার সঙ্গে তুলনা করেছে। প্রতিবেদনের যুক্তি হলো, মেধার এই প্রতিযোগিতাগুলো নতুন ধরনের অভিজাত শ্রেণি তৈরির একটি পথ হয়ে উঠেছে।
আধুনিক আর্থিক বাজারে গণিত ও পরিসংখ্যানের ব্যবহার নতুন নয়। তবে কম্পিউটিং ক্ষমতা, বিপুল তথ্যভান্ডার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির ফলে গাণিতিক দক্ষতার অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেড়েছে।
কোয়ান্ট বা পরিমাণগত বিশ্লেষণভিত্তিক বিনিয়োগে বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ, সম্ভাব্যতা নির্ণয় এবং স্বয়ংক্রিয় লেনদেনের জন্য জটিল গাণিতিক মডেল ও কম্পিউটার প্রোগ্রাম ব্যবহার করা হয়।
একইভাবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে অ্যালগরিদম, সফটওয়্যার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল তৈরিতে উচ্চমাত্রার গাণিতিক ও কম্পিউটেশনাল দক্ষতার প্রয়োজন হয়।
ফলে আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে সাফল্য পাওয়া কোনো তরুণের জন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গবেষণাগার বা বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পরবর্তী সময়ে সেই দক্ষতা বড় অর্থনৈতিক মূল্যে রূপ নিতে পারে।
এই পরিবর্তনের পেছনে প্রযুক্তির বিস্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায় দীর্ঘ সময় ধরে সম্পর্ক, প্রতিষ্ঠান, পুঁজি ও ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা ছিল ক্ষমতার প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে।
ডিজিটাল অর্থনীতিতে সেই কাঠামোর পাশাপাশি নতুন কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—অ্যালগরিদম, তথ্য, কম্পিউটিং ক্ষমতা এবং দ্রুত প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সক্ষমতা।
একজন অসাধারণ প্রোগ্রামার বা গণিতবিদ এখন কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত পদোন্নতির সিঁড়ি অনুসরণ না করেও এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে পারেন, যার বৈশ্বিক বাজার রয়েছে। ইন্টারনেট ও সফটওয়্যারের সীমাহীন বিস্তার এই সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়েছে।
এ কারণে মেধার ব্যক্তিগত বাজারমূল্যও আগের তুলনায় দ্রুত তৈরি হতে পারে। তবে ‘অলিম্পিয়াড ম্যান’-এর উত্থানকে কেবল মেধার জয় হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গণিত বা কম্পিউটার অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়ার সুযোগ নিজেই অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, পারিবারিক সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে মেধা গুরুত্বপূর্ণ হলেও মেধা বিকাশের পরিবেশ সবার জন্য সমান নয়।
এ ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর নতুন অর্থনীতিতে ক্ষমতা কেবল গণিতের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না। বিপুল পুঁজি, তথ্যের মালিকানা, কম্পিউটিং অবকাঠামো, উদ্যোক্তা নেটওয়ার্ক এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ ‘অলিম্পিয়াড ম্যান’ কোনো একক বা সম্পূর্ণ নতুন অর্থনৈতিক শ্রেণির বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা নয়; বরং প্রযুক্তি ও অর্থনীতির পরিবর্তিত সম্পর্ক বোঝাতে দ্য ইকোনমিস্ট যে বর্ণনামূলক ধারণাটি ব্যবহার করেছে, সেটি মূলত তার একটি বিশ্লেষণী ফ্রেম।
‘ডেভোস ম্যান’ ও ‘অলিম্পিয়াড ম্যান’-এর পার্থক্য আসলে দুই ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রতীকী পার্থক্য। একদিকে রয়েছে প্রতিষ্ঠান, সম্পর্ক, কূটনীতি ও নেটওয়ার্কনির্ভর ক্ষমতা; অন্যদিকে রয়েছে গণিত, সফটওয়্যার, অ্যালগরিদম ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা।
বাস্তবে অবশ্য পুরোনো কাঠামো পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়নি। বরং প্রযুক্তি, পুঁজি, প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়েই নতুন ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করছে।
তবু পরিবর্তনটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একসময় যে ধরনের মেধা স্কুলের গণিত প্রতিযোগিতা বা কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের পরিসরে সীমাবদ্ধ বলে মনে হতো, সেটিই এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে মূল্যবান দক্ষতাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
ডেভোসের সম্মেলনকক্ষে যেখানে একসময় বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হতো, সেখানে প্রযুক্তির যুগে সেই ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি অংশ তৈরি হচ্ছে কোড, অ্যালগরিদম, তথ্য ও গাণিতিক মডেলের ভেতরেই।