শাম্মী ইয়াসমিনের চিত্রপ্রদর্শনী: নারী, প্রকৃতি এবং সৌন্দর্যের এক অন্তরঙ্গ আলেখ্য

সফিউদ্দিন শিল্পালয়ের গ্যালারিতে শাম্মী ইয়াসমিনের প্রথম একক চিত্রপ্রদর্শনীর বিভিন্ন শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে

 

সফিউদ্দিন শিল্পালয়ের গ্যালারিতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা নানা আকারের চিত্রকর্মের এক বর্ণাঢ্য সমাহার। শাম্মী ইয়াসমিনের প্রথম একক চিত্রপ্রদর্শনী—এমন একটি অর্জন যা এসেছে দীর্ঘ ৪৮ বছরের শিল্পচর্চার পর। ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে প্রাচ্যকলা বিভাগে বি.এফ.এ ডিগ্রি অর্জনের পর, ৩২ বছর বিসিকের নকশা কেন্দ্রে চাকরির পাশাপাশি শিল্পচর্চা চালিয়ে যাওয়া এই শিল্পীর কাজগুলো দেখলে বোঝা যায়, সময় তাঁর সৃজনশীলতাকে ম্লান করেনি, বরং আরও পরিণত ও পূর্ণতা দিয়েছে।

প্রদর্শনীটি ঘুরে দেখতে দেখতে মনে হয়, শাম্মী ইয়াসমিনের শিল্পকর্ম যেন তাঁর নিজের জীবনেরই এক চিত্রায়ন। একদিকে যেমন রয়েছে বাংলার নারীর মধুর ও সৌন্দর্যমণ্ডিত মুখাবয়ব, তেমনি অন্যদিকে নিসর্গের রূপ—ফুল, পাখি, প্রজাপতি, গাছপালা। শিল্পী সমান দক্ষতার সাথে জলরং, গোয়াস এবং প্রিন্টমেকিং—এই তিনটি ভিন্ন মাধ্যমে নিজেকে মেলে ধরেছেন। বিশেষ করে তাঁর জলরঙের কাজগুলোতে রঙের যে স্বচ্ছতা ও  মসৃণতা দেখা যায়, তা দর্শকের মনে প্রশান্তির অনুভূতি জাগায়।

প্রদর্শনীর একপ্রান্তে চোখে পড়ে নারীদের বিভিন্ন মুহূর্তের চিত্র—কেউ জানালার পাশে বসে পাখির খাঁচার দিকে তাকিয়ে, কেউ বা ফুলের মাঝে বসে, কেউ কবুতর কোলে নিয়ে। এই নারীরা যেন শাম্মী ইয়াসমিনের নিজেরই বিভিন্ন রূপের প্রতীক। একজন নারী হিসেবে, একজন নৃত্যশিল্পী হিসেবে, একজন নকশাবিদ হিসেবে এবং অবশেষে একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে—তাঁর বহুমুখী সত্তার প্রতিফলন এই চিত্রকর্মগুলোতে ধরা পড়েছে। বিশেষ করে যে ছবিতে একজন নারী হলুদ ও নীল শাড়ি পরে কবুতর কোলে নিয়েছেন, সেটি প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণীয় কাজ। নারীর চোখেমুখে যে কোমলতা ও ভালোবাসা ফুটে উঠেছে, তা পাখিটির প্রতি তাঁর স্নেহের বহিঃপ্রকাশ।

প্রকৃতির প্রতি শাম্মী ইয়াসমিনের গভীর ভালোবাসা তাঁর ফুল ও পাখির চিত্রকর্মগুলোতে স্পষ্ট। প্রতিটি ফুলের পাপড়ি, প্রতিটি পাখির পালক—সবকিছু এত যত্ন ও নিখুঁতভাবে আঁকা যে মনে হয় শিল্পী প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। প্রজাপতির ডানার নকশা, ফুলের বিন্যাস, পাখির ডালে বসার ভঙ্গি—এই সব বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ শিল্পীর সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়। বিশেষ করে প্রজাপতি ও ফুলের সমাহার নিয়ে আঁকা বড় ক্যানভাসগুলোতে রঙের যে উৎসব দেখা যায়, তা দর্শককে মুগ্ধ করে।

প্রিন্টমেকিং-এর ক্ষেত্রে শাম্মী ইয়াসমিনের দক্ষতাও প্রশংসনীয়। ব্লক প্রিন্ট, এচিং—এই কৌশলগুলোতে তিনি যে নিখুঁত কারিগরি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, তা প্রমাণ করে যে তিনি শুধু চিত্রশিল্পী নন, বরং একজন পূর্ণাঙ্গ ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট। কালো ও সাদার বৈপরীত্যে আঁকা প্রিন্টগুলোতে যে সাহসী রেখাঙ্কন দেখা যায়, তা জলরঙের কোমলতার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শিল্পসত্তার পরিচয় দেয়।

শাম্মী ইয়াসমিনের শিল্পকর্মের একটি বৈশিষ্ট্য হলো এর আবেগীয় গভীরতা। তাঁর আঁকা নারীরা কেবল সুন্দর নন, তাঁদের চোখেমুখে রয়েছে চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা, বিষাদ এবং স্বপ্ন। যে নারীটি জানালার পাশে বসে পাখির খাঁচার দিকে তাকিয়ে, তার চোখেমুখে যে বিষাদ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে, তা যেন অনেকটা রবীন্দ্রসাহিত্যের নারীচরিত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। আবার যে নারীটি ফুলের মাঝে বসে আছে, তার চারপাশে প্রজাপতি উড়ছে—এই ছবিটি যেন প্রকৃতির সাথে নারীর একাত্মতার প্রতীক।

রঙের ব্যবহারে শাম্মী ইয়াসমিনের যে সাহসিকতা ও দক্ষতা দেখা যায়, তা তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ফল। জলরঙে তিনি যে সৌত পদ্ধতি ও গোয়াস পদ্ধতির ব্যবহার করেছেন, তাতে রঙের স্বচ্ছতা ও গভীরতা দুটোই বজায় রেখেছেন। উজ্জ্বল লাল, নীল, হলুদ, গোলাপি—এই সব রঙের সাহসী ব্যবহার সত্ত্বেও ছবিগুলো চোখের জন্য আরামদায়ক। রঙগুলোর মধ্যে যে সামঞ্জস্য বজায় রেখেছেন, তা প্রমাণ করে যে শিল্পী রঙের তত্ত্ব ও ব্যবহারে অত্যন্ত পারদর্শী।

প্রদর্শনীর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর কিউরেশন। ছবিগুলো দেয়ালে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে দর্শক এক থিম থেকে অন্য থিমে সহজেই যেতে পারেন। নারীর চিত্র, ফুলের ছবি, পাখির চিত্র, প্রিন্টমেকিং—প্রতিটি বিভাগ আলাদাভাবে উপস্থাপিত হলেও সামগ্রিকভাবে একটি সামঞ্জস্য বজায় রেখেছে। কাঠের ফ্রেম এবং সাদা দেয়ালের ব্যবহার ছবিগুলোর রঙকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।

শাম্মী ইয়াসমিনের শিল্পচর্চার পটভূমি জানলে তাঁর কাজগুলোকে আরও গভীরভাবে বোঝা যায়। তিনি শুধু চিত্রশিল্পী নন, তিনি একজন প্রশিক্ষিত নৃত্যশিল্পীও। ১৯৭৩ সালে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকে নৃত্যকলায় ডিপ্লোমা অর্জনের পর থেকেই তিনি শিল্পের বিভিন্ন শাখায় নিজেকে মেলে ধরেছেন। এই নৃত্যকলার প্রশিক্ষণ সম্ভবত তাঁর চিত্রকর্মে এক বিশেষ ছন্দ ও গতিশীলতা এনে দিয়েছে। তাঁর আঁকা নারীদের ভঙ্গিমা, হাতের নড়াচড়া, শরীরের অবস্থান—সবকিছুতেই যেন এক নৃত্যের মতো সাবলীলতা দেখা যায়।

তিনি যে সময়ে চারুকলার শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, তা ছিল বাংলা শিল্পকলার একটি স্বর্ণযুগ। জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দিন আহমদ, কামরুল হাসান, আনোয়ারুল হক, মোহাম্মদ কিবরিয়া—এমন সব কিংবদন্তি শিল্পীদের নির্দেশনায় তিনি বেড়ে উঠেছেন। বিশেষ করে প্রাচ্যকলা বিভাগে আমিনুল ইসলাম ও হাশেম খানের মতো শিক্ষকদের কাছে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তাঁর শিল্পসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এই প্রভাব তাঁর কাজে দেখা যায়—একদিকে যেমন আধুনিক শিল্পচর্চার প্রতি অনুরাগ, অন্যদিকে তেমনি প্রাচ্যকলার ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা।

শাম্মী ইয়াসমিনের এই প্রদর্শনীটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে, এটি তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী, যা তিনি করছেন অবসর গ্রহণের পর। বাংলাদেশের নারী শিল্পীদের জন্য এটি একটি অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ, যিনি চাকরিজীবন ও পারিবারিক দায়িত্বের পাশাপাশি শিল্পচর্চা চালিয়ে গেছেন দীর্ঘ ৪৮ বছর ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হাশেম খান, তাঁর পর্যালোচনায় লিখেছেন যে শাম্মী ইয়াসমিন “নান্দনিক সুষমায় নিজের অহংকে মুক্ত করে তুলতে পেরেছেন”। এই মন্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ শিল্পীর কাজগুলোতে কোনো অহংকার বা অহমিকা নেই—আছে শুধুই নিবেদিত প্রাণ শিল্পচর্চা এবং সৌন্দর্যের প্রতি এক নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।

প্রদর্শনীটি দেখে মনে হয়, শাম্মী ইয়াসমিনের শিল্পকর্মগুলো যেন একটি ডায়েরির পাতা, যেখানে তিনি তাঁর জীবনের বিভিন্ন মুহূর্ত, অনুভূতি এবং স্বপ্নকে রঙ ও রেখায় ধারণ করেছেন। এই কাজগুলো দর্শককে শুধু দৃশ্যমান আনন্দই দেয় না, বরং একটি মানসিক প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির অনুভূতিও জাগায়।

সামগ্রিকভাবে, শাম্মী ইয়াসমিনের এই চিত্রপ্রদর্শনীটি বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটি প্রমাণ করে যে শিল্প কোনো প্রতিযোগিতা বা খ্যাতির খেলা নয়—এটি হলো আত্মপ্রকাশের এক মাধ্যম, আত্মউপলব্ধির এক পথ। শাম্মী ইয়াসমিন এই পথে হেঁটেছেন ধৈর্য সহকারে, নিষ্ঠার সাথে, এবং অবশেষে পৌঁছেছেন এক এমন স্থানে, যেখানে তাঁর শিল্পকর্ম দর্শকের মনে ছাপ ফেলতে সক্ষম।

এই প্রদর্শনী দেখে আশা করা যায়, শাম্মী ইয়াসমিন ভবিষ্যতে আরও নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন এবং বাংলাদেশের শিল্পজগতকে আরও সমৃদ্ধ করবেন। তাঁর এই যাত্রা শুধু তাঁর নিজেরই নয়, এটি অনুপ্রেরণা যুগিয়ে যাবে অনেক নবীন ও প্রবীণ শিল্পীকে, যারা নিজের শিল্পচর্চাকে নিয়ে সংগ্রাম করছেন।

প্রদর্শনীর তথ্যাবলি:
স্থান: সফিউদ্দিন শিল্পালয়, ধানমন্ডি, ঢাকা
তারিখ: ১৮ – ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সময়: প্রতিদিন সকাল ১১:০০ টা থেকে সন্ধ্যা ৭:৩০ মিনিট পর্যন্ত
প্রদর্শনীটি সকলের জন্য উন্মুক্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *