জালালাবাদ এসোসিয়েশন: ঐতিহ্যের সংগঠন থেকে বৃহত্তর সিলেটের উন্নয়ন প্ল্যাটফর্ম?

জালালাবাদ এসোসিয়েশনের লোগো

১৯৪৮ সালে ঢাকায় যে সংগঠনের জন্ম, তার সামনে এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নতুন করে নিজের অর্থ খুঁজে নেওয়ার প্রশ্ন। নাম—জালালাবাদ এসোসিয়েশন। বৃহত্তর সিলেটের মানুষের সামাজিক বন্ধন, পারস্পরিক সহযোগিতা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কল্যাণের যে উদ্দেশ্য নিয়ে সংগঠনটির পথচলা শুরু হয়েছিল, আট দশকের কাছাকাছি সময়ে তার পরিধি স্বাভাবিকভাবেই বদলেছে। দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে সিলেটি জনগোষ্ঠী, বদলেছে তাদের পেশা ও অর্থনৈতিক শক্তি, বেড়েছে প্রবাসী নেটওয়ার্ক। ফলে জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সামনে এখন শুধু ঐতিহ্য ধরে রাখার নয়; সেই ঐতিহ্যকে নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

৩১শে জুলাই ২০২৬ ঢাকার বিয়াম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত দ্বিবার্ষিক নির্বাচনে সভাপতি পদে অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম তরফদার এবং সাধারণ সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন আহমদ নির্বাচিত হয়েছেন।

নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে সংগঠনটির ২০২৬–২০২৭ মেয়াদের যাত্রা শুরু হয়েছে। কিন্তু এই যাত্রার আসল প্রশ্ন নির্বাচন নয়। প্রশ্ন হলো—প্রায় আট দশকের পুরোনো এই সংগঠন আগামী দিনে কী ভূমিকা নেবে?

জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়তো তার কার্যালয়, ভবন কিংবা সাংগঠনিক কাঠামো নয়। এর সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষ।

বৃহত্তর সিলেটের চার জেলা—সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—থেকে উঠে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিশ্বের নানা দেশে ছড়িয়ে আছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিক্ষক, ব্যাংকার, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, প্রশাসক, সাংবাদিক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ককে একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার সক্ষমতাই জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সবচেয়ে বড় সামাজিক পুঁজি।

১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর সংগঠনটি বৃহত্তর সিলেটবাসীর মধ্যে ঐক্য, সম্প্রীতি ও কল্যাণমূলক কার্যক্রমে ভূমিকা রেখে আসছে। ঐতিহাসিকভাবে ঢাকায় বসবাসরত সিলেটিদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার একটি কেন্দ্র হিসেবেও সংগঠনটির গুরুত্ব তৈরি হয়েছে।

কিন্তু সামাজিক পুঁজি তখনই শক্তিতে পরিণত হয়, যখন তাকে সংগঠিতভাবে কাজে লাগানো যায়। এই জায়গাটিই নতুন কমিটির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বৃহত্তর সিলেটকে একক অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে দেখলে জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সামনে একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়।

সিলেটের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা ও নগরকেন্দ্রিক সেবা খাত গুরুত্বপূর্ণ। মৌলভীবাজারের রয়েছে চা, কৃষি ও পর্যটনের সম্ভাবনা। হবিগঞ্জে গ্যাস, শিল্প ও কৃষির বড় ভূমিকা রয়েছে। সুনামগঞ্জের অর্থনীতির সঙ্গে হাওর, কৃষি, মৎস্য ও পর্যটন গভীরভাবে যুক্ত।

অর্থাৎ চার জেলার সমস্যা যেমন আলাদা, তেমনি তাদের সম্ভাবনাও আলাদা। কিন্তু এই চার জেলার মানুষের জ্ঞান, পুঁজি ও নেটওয়ার্ককে একটি প্ল্যাটফর্মে আনা গেলে তৈরি হতে পারে একটি আঞ্চলিক উন্নয়ন-ইকোসিস্টেম।

জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সামনে তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন: সংগঠনটি কি শুধু বৃহত্তর সিলেটের মানুষের সামাজিক মিলনকেন্দ্র থাকবে, নাকি বৃহত্তর সিলেটের উন্নয়নে একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে?

বৃহত্তর সিলেটের সঙ্গে প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক বাংলাদেশের অন্য অনেক অঞ্চলের তুলনায় আলাদা মাত্রার। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক সিলেটি বসবাস করেন। বিভিন্ন দেশে জালালাবাদ নামের সংগঠনও গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সিলেটি সংগঠনগুলো সামাজিক ও কমিউনিটি কার্যক্রমে সক্রিয়।

এই নেটওয়ার্ককে শুধু সামাজিক যোগাযোগ বা অনুদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে সম্ভাবনা অনেক বড়। কারণ প্রবাসী আয় আর প্রবাসী বিনিয়োগ এক জিনিস নয়।

একজন প্রবাসী দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন—এটি পারিবারিক অর্থপ্রবাহ। কিন্তু তিনি যদি সিলেটে একটি হাসপাতাল, হোটেল, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কিংবা পর্যটন প্রকল্পে বিনিয়োগ করেন, তাহলে সেটি তৈরি করে কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

জালালাবাদ এসোসিয়েশন চাইলে এই জায়গায় একটি ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে তৈরি করতে পারে—যেখানে সম্ভাবনাময় প্রকল্প চিহ্নিত হবে, তথ্য যাচাই হবে, স্থানীয় উদ্যোক্তার সঙ্গে প্রবাসী বিনিয়োগকারীর যোগাযোগ তৈরি হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। সংগঠন নিজে ব্যবসা করবে না। বরং হবে একজন ট্রাস্টেড কানেক্টর।

যে কোনো পুরোনো সামাজিক সংগঠনের জন্য তরুণ প্রজন্মকে যুক্ত করা বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা বা পরিচিতিমূলক আয়োজন দিয়ে তরুণদের দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা যায় না। তাদের প্রয়োজন কাজের সুযোগ।

চাকরি, দক্ষতা, মেন্টরশিপ, ইন্টার্নশিপ, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং একটি শক্তিশালী পেশাগত নেটওয়ার্ক।

জালালাবাদ এসোসিয়েশন চাইলে দেশের ও প্রবাসের সফল সিলেটি পেশাজীবীদের সঙ্গে বৃহত্তর সিলেটের তরুণদের একটি মেন্টরশীপ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারে।

লন্ডনের একজন ব্যাংকার সিলেটের একজন তরুণকে ক্যারিয়ার বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারেন। ঢাকার একজন চিকিৎসক হবিগঞ্জের কোনো মেডিকেল শিক্ষার্থীকে মেন্টর করতে পারেন। দুবাইয়ের একজন উদ্যোক্তা সুনামগঞ্জের তরুণ ব্যবসায়ীকে বাজার ও ব্যবসা পরিচালনার বিষয়ে সহায়তা করতে পারেন। এভাবে সংগঠনটি হয়ে উঠতে পারে হিউম্যান ক্যাপিটাল নেটওয়ার্ক ।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জালালাবাদ এসোসিয়েশনের কাজের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। অতীতে সংগঠনটির বিভিন্ন শিক্ষা, চিকিৎসা ও কল্যাণমূলক উদ্যোগের নজির রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পসহ স্বাস্থ্যসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য প্রশ্নটি আরও বড়।

শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া জরুরি। কিন্তু তার পাশাপাশি দরকার দক্ষতা উন্নয়ন, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, চাকরির সঙ্গে সংযোগ এবং মেন্টরশীপ।

একইভাবে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সহায়তা জরুরি। কিন্তু তার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নেটওয়ার্ক, টেলিমেডিসিন, জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং রোগী রেফারেল সিস্টেম তৈরি করা গেলে প্রভাব অনেক বাড়তে পারে।

অর্থাৎ লক্ষ্য হওয়া উচিত—ডোনেশন থেকে ডেভেলপমেন্ট।

জালালাবাদ এসোসিয়েশনের মতো একটি বড় সামাজিক নেটওয়ার্কের জন্য ভবিষ্যতের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হতে পারে একটি শক্তিশালী সদস্য ডেটাবেস।

কতজন সদস্য আছেন, তাদের পেশা কী, কতজন চিকিৎসক, কতজন উদ্যোক্তা, প্রবাসে কোন দেশে কতজন, কার কী এক্সপার্টাইজ, কে মেন্টর করতে চান, কে বিনিয়োগ করতে চান, কে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে চান?

এসব তথ্য সংগঠিতভাবে জানা থাকলে এসোসিয়েশন-এর নেটওয়ার্ক শুধু বড় থাকবে না, বুদ্ধিমানও হবে। ফলে প্রয়োজনের সময় সংগঠনটি সঠিক মানুষকে সঠিক মানুষের সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে।

বৃহত্তর সিলেটের উন্নয়ন নিয়ে অনেক কথা হয়। কিন্তু তথ্যভিত্তিক গবেষণা ও পলিসি এডভোকেসি-এর জায়গাটি তুলনামূলকভাবে কম প্রাতিষ্ঠানিক। জালালাবাদ এসোসিয়েশন চাইলে একটি রিসার্চ এন্ড পলিসি সেন্টার গড়ে তুলতে পারে।

প্রতি বছর প্রকাশ হতে পারে— গ্রেটার সিলেট ইকোনমিক রিপোর্ট । যেখানে থাকবে: প্রবাসী আয় ও বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, পর্যটন, কৃষি ও চা, হাওর অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্প, অবকাঠামো, পরিবেশ বিষয়ক তথ্য।

এর ফলে কোনো দাবি শুধু আবেগের জায়গা থেকে নয়, তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। এতে সরকার, ব্যবসায়ী, গবেষক ও গণমাধ্যমের কাছে সংগঠনটির প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্বও বাড়বে।

সিলেটি পরিচয় জালালাবাদ এসোসিয়েশনের অন্যতম ভিত্তি। ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ তাই সংগঠনটির মৌলিক দায়িত্বের অংশ। কিন্তু সংস্কৃতিকে শুধু উৎসবের মধ্যে আটকে রাখলে এর শক্তি সীমিত থাকে।

সিলেটের ইতিহাস নিয়ে ডিজিটাল আর্কাইভ, ওরাল হিস্টরি প্রজেক্ট, পুরোনো দলিল ও ছবি সংগ্রহ, গবেষণা প্রকাশনা, তরুণদের জন্য হেরিটেজ প্রোগ্রাম—এসব উদ্যোগের মাধ্যমে একটি প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পরিচয় ও ইতিহাসের সেতু তৈরি করা সম্ভব।

নতুন কমিটির কাঠামোতেও শিক্ষা, সাহিত্য ও ছাত্রকল্যাণ; আন্তর্জাতিক ও প্রবাসী কল্যাণ; চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা; সাংগঠনিক ও জনসংযোগ; নারী বিষয়ক এবং সংস্কৃতির মতো আলাদা দায়িত্ব রয়েছে। নির্বাচনের প্রকাশিত ফলাফলেও এসব দায়িত্বের বিভিন্ন পদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের তথ্য পাওয়া যায়।

এখন প্রশ্ন হলো, এসব সাংগঠনিক দায়িত্ব কতটা কার্যকর প্রকল্পে রূপ নেয়।

১৯৪৮ সালের জালালাবাদ ছিল মূলত মানুষকে একত্র করার প্রয়োজন থেকে জন্ম নেওয়া একটি সংগঠন। ২০২৬ সালের জালালাবাদের সামনে সুযোগ আরও বড়—মানুষকে শুধু একত্র করা নয়, তাদের মেধা, দক্ষতা, পুঁজি, অভিজ্ঞতা ও পরিচয়কে একটি কার্যকর নেটওয়ার্কে রূপ দেওয়া।

জালালাবাদ এসোসিয়েশনের ইতিহাস তাকে মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু ইতিহাস কোনো সংগঠনের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে না। ভবিষ্যৎ তৈরি করতে হয়।

অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম তরফদার ও অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে নতুন কমিটির সামনে তাই একটি পুরোনো সংগঠনকে নতুন যুগের প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হয়তো একটাই—বৃহত্তর সিলেটের উন্নয়ন নিয়ে জালালাবাদ এসোসিয়েশন কি শুধু মতামত দেবে, নাকি গবেষণা, তথ্য, দক্ষতা ও নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় একটি কার্যকর ভূমিকা তৈরি করবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *