৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পরও কেন স্বস্তি নেই ভারতীয়দের

অর্থনীতির বড় সংখ্যার সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনের হিসাব মিলছে না কেন

ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বৈপরীত্য তুলে ধরা ইলাস্ট্রেশন

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতার মধ্যেও ভারতের অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন বেড়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। এই হার বাজারের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও একই সময়ের জন্য ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল।

কারখানা, সেবা খাত এবং বিনিয়োগ ছিল এই প্রবৃদ্ধির বড় চালিকাশক্তি। এপ্রিল–জুন সময়ে উৎপাদন খাত বেড়েছে ৯ দশমিক ২ শতাংশ। সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ শতাংশ। স্থায়ী মূলধন বিনিয়োগও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারের জন্য এটি অবশ্যই স্বস্তির খবর। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে। অর্থনীতির আকার দ্রুত বাড়লে সেই পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছাচ্ছে?

ভারতে এখন সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে।

মোট দেশজ উৎপাদন একটি দেশের নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্য পরিমাপ করে। এটি অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র বোঝার গুরুত্বপূর্ণ উপায়। কিন্তু এই একটি সংখ্যা দিয়ে মানুষের আয়, চাকরির নিরাপত্তা, জীবনযাত্রার ব্যয় বা নাগরিক সেবার মান পুরোপুরি বোঝা যায় না। সাম্প্রতিক আলোচনায় ভারতের প্রবৃদ্ধি নিয়ে মূল বিতর্কটি এখানেই।

একদিকে উৎপাদন বাড়ছে। বিনিয়োগ বাড়ছে। ব্যাংক ঋণের চাহিদা রয়েছে। ভোগও শক্তিশালী রয়েছে। অন্যদিকে চাকরির মান, মজুরি এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ভারতীয় অর্থনীতি নিয়ে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোতে এই ব্যবধানের কথাই উঠে এসেছে।

অর্থাৎ অর্থনীতি ভালো করছে—এমন তথ্য এবং মানুষ ভালো আছে—এই দুটি কথা সব সময় একই অর্থ বহন করে না।

ভারতের জন্য কর্মসংস্থান এখনো অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাংক বলছে, আগামী দুই দশকে প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ তরুণ ভারতের শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে। তাদের জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি করা দেশটির অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

সাম্প্রতিক সরকারি জরিপে দেখা যায়, ২০২৬ সালের আগস্টে ১৫ বছর ও তার বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের হার ছিল ৫ শতাংশ। তবে তরুণদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনেক কঠিন। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের বেকারত্বের হার ছিল ১৫ দশমিক ১ শতাংশ। শহরের তরুণদের ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি—১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা দেখায়। সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি থাকলেও শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে চাওয়া তরুণদের অভিজ্ঞতা একই রকম নাও হতে পারে।

সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতার তীব্রতা তার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ। ভারতীয় রেলের বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক প্রার্থী অল্পসংখ্যক পদের জন্য প্রতিযোগিতা করেন। ২০২৫ সালে রেলের প্রায় ২৯ হাজার ৭৭৫টি পদের জন্য প্রথম ধাপের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন প্রায় ৯১ লাখ প্রার্থী। অর্থাৎ প্রতি পদের বিপরীতে গড়ে তিন শতাধিক প্রার্থী ছিলেন।

এ ধরনের প্রতিযোগিতা শুধু চাকরি পাওয়ার কঠিন বাস্তবতাই দেখায় না। এটি তরুণদের কাছে স্থায়ী ও নিরাপদ কর্মসংস্থানের চাহিদার কথাও বলে।

অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনে পৌঁছানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো আয় বৃদ্ধি। মানুষ যদি বেশি আয় করে, তাহলে খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতাও বাড়ে।

কিন্তু সাম্প্রতিক ভারতীয় অর্থনীতি নিয়ে বিশ্লেষণে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির দুর্বলতা এবং পরিবারের ভোগক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সময়ে করপোরেট মুনাফা বাড়লেও তার সমান প্রতিফলন কর্মসংস্থান ও মজুরিতে দেখা যাচ্ছে না—এমন বিশ্লেষণও প্রকাশিত হয়েছে। এখানেই প্রবৃদ্ধির বণ্টনের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

অর্থনীতির মোট আয় বাড়লেই প্রত্যেক পরিবারের আয় একই হারে বাড়ে না। নতুন বিনিয়োগের বড় অংশ যদি বেশি উৎপাদনশীল, পুঁজি-নির্ভর খাতে যায়, তাহলে উৎপাদন দ্রুত বাড়তে পারে। কিন্তু সেই উৎপাদন বৃদ্ধির তুলনায় নতুন কর্মসংস্থান কম হতে পারে।

ফলে জাতীয় আয় বাড়লেও অনেক পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা একই গতিতে বাড়ে না। জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রশ্নটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

২০২৬ সালের আগস্টে ভারতের ভোক্তা মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৮২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ে এই হার ছিল ৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে। আগস্টে খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

পাইকারি বাজারেও মূল্যচাপ আরও তীব্র হয়েছে। আগস্টে ভারতের পাইকারি মূল্যসূচক এক বছর আগের তুলনায় ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে মূল্যবৃদ্ধি ছিল ২২ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক ভারতীয় একই মাত্রায় সংকটে আছেন। কিন্তু খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়লে নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারের ওপর তার প্রভাব তুলনামূলক বেশি পড়ে।

ফলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সুফল বোঝার ক্ষেত্রে শুধু আয় বাড়ছে কি না, সেটিই যথেষ্ট নয়। আয় বাড়ার সঙ্গে ব্যয় কতটা বাড়ছে, সেটিও দেখতে হয়।

ভারতের বর্তমান অর্থনীতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এর ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন গতির উপস্থিতি।

একদিকে বড় শিল্প, আর্থিক সেবা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। অন্যদিকে শ্রমবাজারের একটি বড় অংশ এখনো এমন কাজে যুক্ত, যেখানে আয় কম এবং চাকরির নিরাপত্তা সীমিত।

বিশ্বব্যাংকও ভারতের প্রবৃদ্ধিকে আরও কর্মসংস্থাননির্ভর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের সাম্প্রতিক ভারতীয় অংশীদারত্ব কাঠামোর অন্যতম লক্ষ্য হলো তরুণ ও নারীদের জন্য উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়ানো। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি শুধু সমালোচকদের উত্থাপিত বিষয় নয়। ভারতের উন্নয়ন নীতিতেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে স্বীকৃত।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো এটি নাগরিক জীবনের সব অভিজ্ঞতা পরিমাপ করে না।

একটি শহরে নতুন সড়ক, রেলপথ বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান তৈরি হলে তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে পারে। কিন্তু একই শহরে যদি যানজট, দূষণ, আবাসনের ব্যয়, চিকিৎসার খরচ বা শিক্ষার ব্যয় বেড়ে যায়, তাহলে মানুষের জীবনের সামগ্রিক স্বস্তি একই অনুপাতে বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

এই কারণে একটি দেশের অর্থনৈতিক সাফল্য বোঝার ক্ষেত্রে আয় ও উৎপাদনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, প্রকৃত মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয়, জনসেবা এবং সম্পদের বণ্টনের দিকও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

এখানে সতর্ক থাকা জরুরি।

ভারতের ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে সরাসরি অবাস্তব বলে দেওয়ার মতো প্রমাণ নেই। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি হয়েছে এবং উৎপাদন, সেবা, বিনিয়োগ ও ভোগের বেশ কিছু সূচকও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শক্তিশালী অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে পরিসংখ্যানের পদ্ধতি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত মোট দেশজ উৎপাদনের হিসাবের ভিত্তিবছর পরিবর্তন করেছে। নতুন পদ্ধতি ও তথ্যের উৎস ব্যবহারের ফলে পুরোনো হিসাবও সংশোধন করা হয়েছে। কয়েকজন অর্থনীতিবিদ নতুন হিসাবের পদ্ধতি এবং মূল্য সমন্বয়ের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ভারত সরকার অবশ্য নতুন পদ্ধতিকে সমর্থন করেছে।

অতএব বিষয়টি সরলভাবে ‘প্রবৃদ্ধি সত্য’ অথবা ‘প্রবৃদ্ধি মিথ্যা’—এই দুই ভাগে ভাগ করার সুযোগ নেই। বরং বড় প্রশ্ন হলো, এই প্রবৃদ্ধির চরিত্র কী এবং তার সুফল কতটা বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাচ্ছে।

ভারতের অর্থনীতির সাম্প্রতিক চিত্রে একটি আপাত বৈপরীত্য স্পষ্ট। জাতীয় অর্থনীতির হিসাবে দেশটি দ্রুত এগোচ্ছে। বিনিয়োগ বাড়ছে। উৎপাদন ও সেবা খাত শক্তিশালী। ভোগও এখনো টিকে আছে। একই সময়ে তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে চাপ রয়েছে। মূল্যস্ফীতি আবার বাড়ছে। আয় ও সম্পদের বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন আছে। এই দুই চিত্র পরস্পরবিরোধী হওয়া জরুরি নয়।

একটি অর্থনীতি একই সঙ্গে দ্রুত বাড়তে পারে এবং সেই প্রবৃদ্ধির সুফল অসমভাবে বণ্টিত হতে পারে। জাতীয় আয় বাড়তে পারে, কিন্তু পরিবারের হাতে থাকা আয় সেই অনুপাতে না-ও বাড়তে পারে। নতুন অবকাঠামো তৈরি হতে পারে, কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়তে পারে।

সেখানেই ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আসল প্রশ্ন। অর্থনীতির বড় সংখ্যা দেশের সক্ষমতা দেখায়। কিন্তু মানুষের জীবন দেখায় সেই সক্ষমতার ব্যবহার কতটা বিস্তৃত হয়েছে।

ভারতের সামনে তাই শুধু দ্রুত প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার প্রশ্ন নয়। সেই প্রবৃদ্ধিকে আরও বেশি কর্মসংস্থান, আয়, নিরাপত্তা ও জীবনমানের উন্নতিতে রূপ দেওয়ার প্রশ্নও রয়েছে।

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের অর্থনীতি কত দ্রুত বেড়েছে, তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনে সেই পরিবর্তন কতটা দৃশ্যমান হয়েছে—উন্নয়নের হিসাব সেখানে গিয়েই পূর্ণ হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *