ভেপিং শরীরের কোন কোন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে?

ভেপিং বা ই-সিগারেট ব্যবহারের স্বাস্থ্যঝুঁকি

ডা: মো. মশিউর রহমান মোল্লা

ভেপিং বা ই-সিগারেটকে অনেকেই প্রচলিত সিগারেটের তুলনায় নিরাপদ বিকল্প মনে করেন। বিশেষ করে ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করছেন—এমন অনেকেই নিকোটিন গ্রহণের বিকল্প হিসেবে ভেপিং বেছে নেন। কিন্তু ‘সিগারেটের তুলনায় কম ক্ষতিকর’ আর ‘ক্ষতিহীন’—দুটি বিষয় এক নয়।

ই-সিগারেটের অ্যারোসলকে সাধারণ জলীয় বাষ্প মনে করারও সুযোগ নেই। এতে নিকোটিন ছাড়াও ক্ষতিকর বা সম্ভাব্য ক্ষতিকর রাসায়নিক, অতি সূক্ষ্ম কণা, ভোলাটাইল অর্গানিক কমপাউন্ডস এবং কিছু ভারী ধাতু থাকতে পারে। ফলে নিয়মিত ভেপিং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

ভেপিংয়ের অ্যারোসল সরাসরি শ্বাসনালির ভেতর প্রবেশ করে। গবেষণায় ভেপিংয়ের সঙ্গে শ্বাসনালির প্রদাহ, ফুসফুসের কার্যকারিতার পরিবর্তন এবং কিছু শ্বাসযন্ত্রের সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে ভেপিংয়ের কারণে কতদিনে স্থায়ী ফুসফুসের ক্ষতি হয়—এমন নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনও চলছে।

নিকোটিনযুক্ত ভেপিং সাময়িকভাবে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়াতে পারে। নিকোটিন শরীরের সিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় করে, যার ফলে হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালিতে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। নিয়মিত ভেপিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা চলছে। তাই সাময়িক শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনকে সরাসরি দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণ হিসেবে দেখানোও ঠিক নয়।

বেশির ভাগ ভেপেই নিকোটিন থাকে। নিকোটিন অত্যন্ত আসক্তিকর এবং নিয়মিত ব্যবহারে মস্তিষ্ক নিকোটিনের উপস্থিতির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিকাশমান মস্তিষ্ক নিকোটিনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং আসক্তির ঝুঁকি তৈরি হয়।

ভেপিংয়ের সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে মুখ ও গলা শুষ্ক হওয়া, কাশি এবং মুখ-গলায় জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা রয়েছে। গবেষণায় ভেপিংয়ের সঙ্গে পেরিওডন্টাল হেলথ-এর নেতিবাচক সম্পর্কের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং নির্দিষ্ট ঝুঁকির মাত্রা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

যুক্তরাজ্যের এনএইচএস-এর মতে, ভেপিং ঝুঁকিমুক্ত নয়; তবে যারা ইতিমধ্যে সিগারেট খান, তারা সম্পূর্ণভাবে সিগারেট ছেড়ে ভেপিংয়ে পরিবর্তিত হলে ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ কমতে পারে। অর্থাৎ ধূমপান চালিয়ে যাওয়ার তুলনায় ভেপিং কম ক্ষতিকর হতে পারে ।কিন্তু যারা ধূমপান করেন না, তাদের জন্য ভেপিং শুরু করার যুক্তিসংগত কারণ নেই।

একই সঙ্গে সিগারেট ও ভেপ—দুটিই ব্যবহার করাও নিরাপদ সমাধান নয়। সিডিসি বলছে, এই ধরনের ডুয়াল ইউজ ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শ বাড়াতে পারে এবং শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ভেপিং নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কখনো কখনো নির্দিষ্ট মিনিট, ঘণ্টা বা বছরের সঙ্গে নির্দিষ্ট অঙ্গের ক্ষতির সম্পর্ক দেখানো হয়। যেমন—কতটি টানে একটি সিগারেটের সমপরিমাণ নিকোটিন পাওয়া যায়, কত দিনে ফুসফুসে স্থায়ী ক্ষতি হয় কিংবা কয়েক বছরে কোনো রোগের ঝুঁকি কত শতাংশ বাড়ে।

বাস্তবে ভেপিংয়ের প্রভাব নির্ভর করে ডিভাইসের ধরন, নিকোটিনের ঘনত্ব, ব্যবহারের সময়কাল এবং ব্যবহারকারীর টান নেওয়ার পদ্ধতির ওপর। তাই একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাকে সব ধরনের ভেপারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

ভেপিংকে ‘নিরাপদ’ বলা ঠিক নয়। একই সঙ্গে এটিকে প্রচলিত সিগারেটের সমান ক্ষতিকর বলাও বর্তমান প্রমাণের সঙ্গে সব ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যারা ধূমপান করেন, তাদের জন্য সিগারেট পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর পথ। আর যারা ধূমপান করেন না, তাদের ভেপিং শুরু না করাই নিরাপদ।

ভেপিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে বিজ্ঞান এখনো আরও তথ্য সংগ্রহ করছে। তাই এ বিষয়ে সবচেয়ে দায়িত্বশীল অবস্থান হলো—ঝুঁকিকে ছোট করে না দেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *