বাংলাদেশের জাতীয় প্রতিরক্ষা কলেজের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর।
জাতীয় প্রতিরক্ষা কোর্স-২০২৬-এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত বিদেশভিত্তিক শিক্ষা সফরে অংশ নিতে ২৪ সদস্যের প্রতিনিধিদলটি গত ৯ই সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে যায়। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন জাতীয় প্রতিরক্ষা কলেজের কমান্ড্যান্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. ফয়জুর রহমান।
সফরের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১১ই সেপ্টেম্বর প্রতিনিধিদলটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর পরিদর্শন করে। সেখানে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান। পরে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিনিময় হয়।
আলোচনায় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা এবং উভয় দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। প্রশ্নোত্তর পর্বের মধ্য দিয়ে মতবিনিময় আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
সফরের শুরুতে ওয়াশিংটন ডিসির বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন খান এবং মন্ত্রী কনস্যুলার মো. মাহবুবুর রহমান প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান।
সফরকালে প্রতিনিধিদলটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর, প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর, জাতীয় প্রতিরক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, জাতিসংঘ সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি, সামরিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে। এসব প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তারা মতবিনিময় করেন।
১৪ই সেপ্টেম্বর প্রতিনিধিদলটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পরিদর্শন করে। সেখানে এশিয়াবিষয়ক রাজনৈতিক-সামরিক কার্যক্রমের উপপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল স্টিফেন অলড্রিজ এবং দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক নীতিনির্ধারণী পরিচালক জে ওয়াইজ প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান।
এ সময় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, সামরিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ে আলোচনা হয়। ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠে আসে।
পেন্টাগন সফরের পর প্রতিনিধিদলটি ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাস পরিদর্শন করে। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম তাদের স্বাগত জানান। তিনি দূতাবাসের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিনিধিদলকে অবহিত করেন। পরে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রতিনিধিদলের মতবিনিময় হয়।
১৫ই সেপ্টেম্বর প্রতিনিধিদলটি বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল পরিদর্শন করে। বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক নীলকণ্ঠ মিশ্র এবং বিকল্প নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুর রহমান খান প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান।
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মকর্তারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিনিধিদলকে অবহিত করেন। পরে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক উঠে আসে। বিশ্বব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এই প্রতিনিধিত্বকারী গোষ্ঠীর আওতায় বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও শ্রীলঙ্কা রয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসিতে সফরের শেষ পর্যায়ে প্রতিনিধিদলটি জাতীয় প্রতিরক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিকটপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক কৌশলগত অধ্যয়ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে।
জাতীয় প্রতিরক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রাষ্ট্রদূত রোক্সান ক্যাবরাল এবং কৌশলগত অধ্যয়ন কেন্দ্রের পরিচালক রাষ্ট্রদূত জন ডেসরোচার প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান। পরে প্রতিনিধিদলের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. ফয়জুর রহমান এবং জ্যেষ্ঠ নির্দেশনা কর্মকর্তা এয়ার ভাইস মার্শাল মো. শফিকুল ইসলাম তাঁদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেন।
এরপর প্রতিনিধিদলটি কৌশলগত অধ্যয়ন কেন্দ্র আয়োজিত বক্তা ধারাবাহিকের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। সেখানে কৌশলগত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, প্রতিরক্ষা শিক্ষা, নেতৃত্বের বিকাশ এবং সমসাময়িক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
১৫ই সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন ডিসির কার্যক্রম শেষে প্রতিনিধিদলটি নিউইয়র্কে যায়। পরদিন ১৬ই সেপ্টেম্বর তারা জাতিসংঘ সদর দপ্তর পরিদর্শন করে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বিভাগের সামরিক বিষয়ক কার্যালয়ের প্রধান কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াকাইয়া দিওপ প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান। তিনি কার্যালয়ের কার্যক্রম এবং বিভিন্ন মাঠপর্যায়ের শান্তিরক্ষা মিশনে জাতিসংঘের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিনিধিদলকে বিস্তারিত অবহিত করেন।
পরে প্রতিনিধিদলটি নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন পরিদর্শন করে। সেখানে মিশনের ভূমিকা ও কার্যক্রম এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তাদের অবহিত করা হয়।
জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন জুবাইদা খান এ সময় উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান ও অংশগ্রহণের বিভিন্ন দিকও তুলে ধরেন।
জাতীয় প্রতিরক্ষা কলেজের এই শিক্ষা সফরের মাধ্যমে জাতীয় প্রতিরক্ষা কোর্স-২০২৬-এর অংশগ্রহণকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাকাঠামো, প্রতিরক্ষা নীতি ও কৌশলগত পরিকল্পনা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ পান।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁদের ধারণা আরও বিস্তৃত হয়।
ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশের দূতাবাস এবং নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের কার্যক্রম সম্পর্কেও তাঁরা সরাসরি ধারণা পান। সংশ্লিষ্ট মার্কিন ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক সম্পর্কেও তাঁদের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ হয়।