অতিরিক্ত গরম পানীয় ক্যান্সারের ঝুঁকি তিনগুণ বাড়াতে পারে

এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা

 

চা বা কফি অনেকেরই দিন শুরুর অপরিহার্য সঙ্গী। কিন্তু এই পানীয়টি যদি অতিরিক্ত গরম অবস্থায় পান করা হয়, তবে তা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক একটি বৃহৎ গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য: অতিরিক্ত গরম চা বা কফি পান করলে ইসোফেজিয়াল বা খাদ্যনালীর ক্যান্সারের ঝুঁকি তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এই গবেষণার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ ক্যান্সারে প্রকাশিত এই গবেষণায় প্রায় ১০ লাখ মধ্যবয়সী মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ‘মিলিয়ন উইমেন স্টাডি’ এবং ‘ইউকে বায়োব্যাংক’-এর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গবেষকরা দেখেছেন, যারা তাদের পানীয় ‘উষ্ণ’ (ওয়ার্ম) রাখার পরিবর্তে ‘অতিরিক্ত গরম’ (ভেরি হট) পান করতে পছন্দ করেন, তাদের ইসোফেজিয়াল স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা (এসসিসি)-এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণের তুলনায় তিন গুণ বেশি। যারা পানীয় ‘গরম’ পান করেন, তাদের ঝুঁকিও উষ্ণ পানীয় পানকারীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

শুধু তাপমাত্রাই নয়, পানীয়ের পরিমাণও ঝুঁকির একটি বড় কারণ। গবেষকরা তাপমাত্রার প্রভাব বাদ দিয়েও দেখেছেন, যারা দিনে ৬ বা তার বেশি গরম পানীয় পান করেন, তাদের ইসোফেজিয়াল এসসিসি-এর ঝুঁকি ৬-এর কম পানীয় পানকারীদের তুলনায় ৭১% বেশি।

গবেষণার মূল লেখক এবং অক্সফোর্ড পপুলেশন হেলথের সিনিয়র নিউট্রিশনাল এপিডেমিওলজিস্ট কেরেন প্যাপির বলেন, “এটি এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে সবচেয়ে বড় গবেষণা, যা অতিরিক্ত গরম পানীয় পানের সাথে এই ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকির সম্পর্ককে আরও জোরালো করে।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ক্যান্সার বিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি) আগেই ২০১৬ সালে ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (১৪৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট) উপরে তাপমাত্রার পানীয়কে ‘সম্ভাব্য কার্সিনোজেনিক’ বা ক্যান্সার সৃষ্টিকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ইংল্যান্ডের কোয়াড্রাম ইনস্টিটিউটের এপিথেলিয়াল ফিজিওলজিস্ট ইয়ান জনসন বলেন, “গরম তরল পদার্থ খাদ্যনালীর আস্তরণের কোষগুলোর ক্ষতি করে এবং প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। তাই ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে ঠান্ডা পানীয় পান করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।”

গবেষকরা জানিয়েছেন, এই ঝুঁকি কমানো খুবই সহজ। কেরেন প্যাপির পরামর্শ দেন, “যারা গরম পানীয় পান করতে পছন্দ করেন এবং এই তথ্য নিয়ে চিন্তিত, তাদের জন্য সবচেয়ে সহজ সমাধান হলো পানীয়টি কিছুক্ষণ ঠান্ডা হতে দেওয়া। এতে একটু ঠান্ডা পানি বা দুধ মিশিয়ে নেওয়া, ফুঁ দেওয়া বা ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে পান করা যেতে পারে।”

তবে গবেষকরা একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, ইসোফেজিয়াল ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সামগ্রিক ঝুঁকি এখনও তুলনামূলকভাবে কম। যুক্তরাজ্যে এটি মোট ক্যান্সারের মাত্র ২% এবং সেখানে মানুষের সারাজীবনে এটি হওয়ার ঝুঁকি মাত্র ১%। কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের অধ্যাপক মুই-টেক তেহ সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যেহেতু তাপমাত্রা অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে রিপোর্ট করা হয়েছে, তাই এটিকে ‘দৃঢ় সম্পর্ক’ হিসেবে দেখা উচিত, চূড়ান্ত কার্যকারণ প্রমাণ হিসেবে নয়। তবুও সতর্কতাই ভালো।

উল্লেখ্য, এই ধরনের ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হলো ধূমপান। তবে এই গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, চা বা কফির মতো দৈনন্দিন পানীয়ের স্বাদ উপভোগ করার পাশাপাশি এর তাপমাত্রার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। একটু ধৈর্য ধরে পানীয় ঠান্ডা করে পান করাই হতে পারে ক্যান্সার প্রতিরোধের একটি সহজ, সাশ্রয়ী ও কার্যকরী উপায়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *