রাজধানীর গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের দীপবরনপুরে। মেট্রোরেল প্রকল্পের এমআরটি লাইন-৫-এর নির্মাণকাজের জন্য বর্তমান টার্মিনাল এলাকা প্রয়োজন হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
টার্মিনাল স্থানান্তরের সবচেয়ে বড় বাধা এখন জমি হস্তান্তর। এ জটিলতা কাটাতে ১৪ই সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় সভা করেছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। সভায় জমি হস্তান্তরসহ স্থানান্তরের পরবর্তী কার্যক্রম চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।
ডিটিসিএ সূত্র জানায়, এমআরটি লাইন-৫-এর নর্দার্ন রুটের পাশাপাশি প্রস্তাবিত সাউদার্ন রুটের নির্মাণকাজের সঙ্গেও গাবতলী টার্মিনাল স্থানান্তরের বিষয়টি যুক্ত। গাবতলী এলাকায় মেট্রোরেলের ডিপো এবং নির্মাণসামগ্রী রাখার জায়গা প্রয়োজন হবে। ফলে বর্তমান বাস টার্মিনালটি সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমানের ভাষ্য, ডিসেম্বরের মধ্যে স্থানান্তর প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। নতুন জায়গা প্রস্তুত হওয়ার পর গাবতলীর আন্তঃজেলা বাসগুলো পর্যায়ক্রমে সেখানে নেওয়া হবে।
দীপবরনপুরে টার্মিনালের জন্য প্রস্তাবিত জায়গার একাংশ গণপূর্ত অধিদপ্তর, ঢাকা জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মালিকানাধীন। এসব জমি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কাছে হস্তান্তরের পর টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তুতি শুরু হবে।
প্রথমে জায়গাটি ভরাট ও উঁচু করা হবে। এরপর বাস টার্মিনাল ব্যবহারের উপযোগী অবকাঠামো তৈরি করা হবে। প্রস্তুতি শেষ হলে গাবতলী থেকে বাসগুলো পর্যায়ক্রমে নতুন টার্মিনালে স্থানান্তর করা হবে।
স্থানান্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রায় ৩৫টি সরকারি ও সেবা সংস্থা যুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে রাজউক, বিআরটিসি, ডিএমপি, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ডিএনসিসি, ডিএমটিসিএল, ডেসকো, তিতাস গ্যাস এবং ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়।
গাবতলী এলাকায় এমআরটি লাইন-৫-এর অবকাঠামো নির্মাণের জন্য জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালেও সরকার জানিয়েছিল, লাইন-৫ নর্দার্ন রুটের গাবতলী পাতাল স্টেশন নির্মাণের কারণে বর্তমান টার্মিনালকে অস্থায়ীভাবে সরানোর প্রয়োজন হবে। তখন টার্মিনালের দক্ষিণ পাশে বিকল্প জায়গা ব্যবহারের পরিকল্পনাও আলোচনায় ছিল।
এর মধ্যে এমআরটি লাইন-৫-এর সাউদার্ন রুটের পরিকল্পনাও এগিয়েছে। প্রস্তাবিত এই রুট গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাবে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল অর্থাৎ গাবতলী এখন শুধু একটি বাস টার্মিনাল নয়। এটি ঢাকার ভবিষ্যৎ গণপরিবহন অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হয়ে উঠছে।
গাবতলী স্থানান্তরের উদ্যোগটি আলাদা কোনো সিদ্ধান্ত নয়। রাজধানীর যানজট কমাতে গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ ও গুলিস্তানের বাস টার্মিনালগুলো শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।
৬ই সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে চার টার্মিনালের ডিপো পরিপূর্ণভাবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে টার্মিনাল স্থানান্তর ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগের কথা জানানো হয়।
সরকারের যুক্তি, রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে দূরপাল্লার বাস, বাসের অপেক্ষমাণ যান এবং এলোমেলো পার্কিং নগরীর যানজট বাড়ায়। টার্মিনালগুলো শহরের বাইরে সরানো গেলে প্রবেশপথে যানবাহনের চাপ কমানো সম্ভব হবে।
তবে টার্মিনাল স্থানান্তরের উদ্যোগ বাস্তবায়নে পরিবহন খাতের একাংশের অসহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। মালিক সমিতির কয়েকজন নেতার দাবি, রাজনৈতিক ও পরিবহন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের তদবিরের কারণে টার্মিনাল স্থানান্তরের উদ্যোগ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তারা আরও অভিযোগ করেছেন, এ নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে সমঝোতার চেষ্টা চলছে। এমনকি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে । পরিবহন নেতাদের একাংশ সাবেক পরিবহন নেতা খন্দকার এনায়েত উল্লাহ, মহাখালী টার্মিনালকেন্দ্রিক কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং পরিবহন নেতা সাদিকুর রহমান হিরুর বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলেছেন। এসব অভিযোগও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দাবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক অবশ্য বলেছেন, মালিক সমিতি সরাসরি স্থানান্তরের বিরোধিতা না করলেও তাদের কার্যক্রমে ধীরগতি রয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা থাকলেও জনস্বার্থে মেগা প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টার্মিনাল সরানোর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।
গাবতলী টার্মিনাল সরানোর সিদ্ধান্তের মূল কাঠামো এখন স্পষ্ট। দীপবরনপুরে জমি হস্তান্তর, জায়গা ভরাট ও উঁচু করা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ এবং পরে বাস স্থানান্তর—এই ধাপগুলো শেষ করতে হবে কয়েক মাসের মধ্যে।
ডিসেম্বরের সময়সীমা তাই গুরুত্বপূর্ণ। জমি হস্তান্তর বা অবকাঠামো প্রস্তুতিতে বিলম্ব হলে পুরো পরিকল্পনাই পিছিয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে গাবতলী এলাকায় মেট্রোরেল অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে বাস টার্মিনাল সরানোর কাজও সমন্বয় করতে হবে। ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় বাস ও মেট্রোরেলের ভবিষ্যৎ সংযোগ কতটা কার্যকর হবে, তার একটি বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে এই স্থানান্তর।
গাবতলী বাস টার্মিনাল স্থানান্তর শুধু একটি টার্মিনাল সরানোর প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এমআরটি লাইন-৫-এর নির্মাণ, ঢাকার যানজট কমানোর পরিকল্পনা এবং রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বিন্যাস। ডিসেম্বরের মধ্যে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা গেলে এটি ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।