বাংলাদেশে গৃহকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে আইনগত স্বীকৃতির পথ আরও এগিয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এ গৃহকর্মীর সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অনানুষ্ঠানিক ও অদৃশ্য শ্রমের একটি অংশ প্রথমবারের মতো শ্রম আইনের কাঠামোয় জায়গা পেয়েছে। তবে এই স্বীকৃতি এখনো পূর্ণাঙ্গ শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করেনি।
গত ১০ই এপ্রিল বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬ কার্যকর হয়। সংশোধিত আইনে গৃহকর্মী বলতে নিয়োগকারীর গৃহে মৌখিক বা লিখিতভাবে খণ্ডকালীন কিংবা পূর্ণকালীন ভিত্তিতে গৃহকর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে। মেস ও ছাত্রাবাসকেও এই সংজ্ঞায় গৃহের আওতায় রাখা হয়েছে।
তবে আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সংশোধিত আইনে গৃহকর্মীদের সাধারণভাবে শ্রম আইনের আওতায় আনা হয়নি। দ্বাদশ, ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ অধ্যায়ের প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে স্বীকৃতি এলেও গৃহকর্মীদের জন্য সব ধরনের শ্রম অধিকার একসঙ্গে কার্যকর হয়েছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না।
সংশোধিত আইনে গৃহকর্মীদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। আইনের একটি সংশোধিত ধারায় গৃহকর্মীদের ট্রেড ইউনিয়নের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে জবরদস্তিমূলক শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা, হয়রানি ও বৈষম্য প্রতিরোধের বিষয়েও আইনে নতুন বিধান যুক্ত হয়েছে।
এই আইনগত পরিবর্তনের পেছনে দীর্ঘদিনের অধিকার আন্দোলন ও নীতিগত প্রচেষ্টার ভূমিকা রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল নারী গৃহকর্মীদের অধিকার, দক্ষতা, নেতৃত্ব ও সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর সাত বছরের একটি প্রকল্প।
২০১৯ সাল থেকে কানাডা সরকার এই উদ্যোগে ১ কোটি ১৩ লাখ ডলার সহায়তা দিয়েছে। অক্সফাম বাংলাদেশ ও সহযোগী সংগঠনগুলো মিলে ‘বাংলাদেশে নারী গৃহকর্মীদের অধিকার সুরক্ষা’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল নারী গৃহকর্মীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, দক্ষতা উন্নয়ন, নেতৃত্ব তৈরি এবং শ্রম আইনে তাঁদের স্বীকৃতির জন্য নীতিগত পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা।
প্রকল্পের সাত বছরের কার্যক্রমের সমাপনী অনুষ্ঠানে বুধবার (২৩শে সেপ্টেম্বর) ঢাকায় প্রকল্পের মূলায়ন বিষয়ক একটি বই এর প্রকাশনা অনুষ্ঠান করা হয়। এতে প্রকল্পের সাত বছরের অভিজ্ঞতা, নীতিগত বিশ্লেষণ, অর্জন এবং নারী গৃহকর্মীদের জীবনের ১০টি অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রকল্পের চূড়ান্ত মূল্যায়নে গৃহকর্মীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া গেছে। ২০১৯ সালে যেখানে ১২ শতাংশ গৃহকর্মী নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৭৪ শতাংশে দাঁড়ায়। মজুরি নিয়ে দর-কষাকষির সক্ষমতা ২৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬১ শতাংশ হয়েছে। লিখিত কর্মসংস্থান চুক্তির হারও ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৮ শতাংশ হয়েছে।
মূল্যায়নে আরও দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া ৪১ শতাংশ গৃহকর্মী জানিয়েছেন, তাঁদের মজুরি বেড়েছে। তাঁদের গড় মাসিক আয় বেড়েছে ৮৫০ টাকা। একই সময়ে গৃহকর্মীদের অধিকার নিয়ে নিয়োগকারীদের সচেতনতার হার ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ শতাংশ হয়েছে। অধিকার নিয়ে প্রচার ও সংগঠিত কার্যক্রমে অংশগ্রহণের হারও বেড়েছে।
তবে বাস্তবতার সঙ্গে আইনগত স্বীকৃতির ব্যবধান এখনো বড়। গৃহকর্মীদের কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, সামাজিক সুরক্ষার সীমিত সুযোগ এবং লিখিত চুক্তির অভাব এখনো বড় সমস্যা হিসেবে রয়েছে। প্রকল্পের মূল্যায়নেও এসব চ্যালেঞ্জের কথা উঠে এসেছে।
অনুষ্ঠানে কানাডার বৈশ্বিক বিষয়ক দপ্তরের সহযোগিতা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান জেন পামার বলেন, গৃহকর্মীদের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও সম্মিলিতভাবে সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে প্রকল্পটি ভূমিকা রেখেছে। তাঁর মতে, এখন পরবর্তী ধাপ হলো আইনগত স্বীকৃতিকে বাস্তব সুরক্ষায় রূপ দেওয়া। যাতে গৃহকর্মীরা মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে কাজ করতে পারেন এবং তাঁদের জীবন ও কাজকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তে নিজেদের মতামত জানাতে পারেন।
শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, সংশোধিত শ্রম আইনে গৃহকর্মীদের স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা আংশিক। তাঁর মতে, নারী গৃহকর্মীদের অধিকার এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। সংগঠন ও নেতৃত্বের কাঠামো আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক নীরান রামজুথান বলেন, গৃহকর্মীদের অদৃশ্য ও অনানুষ্ঠানিক শ্রম থেকে অধিকতর আইনগত সুরক্ষার দিকে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। অন্যদিকে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের দেশীয় পরিচালক ফারাহ কবির গৃহকর্মে শিশুদের নিয়োগ বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
গৃহকর্মীদের অধিকার নিয়ে ২০২৫ সালের এক আয়োজনে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেছিলেন, গৃহকর্মীদের আনুষ্ঠানিক খাতে আনার চেষ্টা চলছে। তিনি মজুরি, দক্ষতা, ছুটি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, অসুস্থতাজনিত ছুটি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের মতো অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
গৃহকর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নেও প্রকল্পের আওতায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালে চার লাখের বেশি নয়, বরং দেশের প্রায় ৪০ লাখ গৃহকর্মীকে লক্ষ্য করে একটি বিনা মূল্যের প্রশিক্ষণভিত্তিক অনলাইন শিক্ষামঞ্চ চালু করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল গৃহকর্মীদের দক্ষতা ও কাজের সুযোগ বাড়ানো।
সংশোধিত শ্রম আইন তাই গৃহকর্মীদের অধিকার আন্দোলনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে আইনে নাম যুক্ত হওয়াই শেষ কথা নয়। লিখিত নিয়োগের ব্যবস্থা, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা, দক্ষতার স্বীকৃতি এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
গৃহকর্মীদের শ্রমকে পরিবার ও অর্থনীতির প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের মানুষ ও শ্রমিক হিসেবে মর্যাদা নিশ্চিত করাই এখন পরবর্তী চ্যালেঞ্জ। আইনগত স্বীকৃতিকে বাস্তব সুরক্ষায় রূপ দিতে সরকার, নিয়োগকারী, নাগরিক সমাজ এবং গৃহকর্মীদের সংগঠন—সব পক্ষের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।